একজন কাকলী ও কাকলী বাসস্ট্যান্ড নামকরণের পেছনের কথা

জাগো কণ্ঠ ডেস্ক

১৮ মে, ২০২২ ০৯:৪০ পূর্বাহ্ন

একজন কাকলী ও কাকলী বাসস্ট্যান্ড নামকরণের পেছনের কথা

ছবিতে শেখ হাসিনা যাকে কেক খাওয়াচ্ছেন তিনি শেখ ফেরদৌসী কাজল (কাকলী), দুঃসাহসী এক নারী, যার নামে রাজধানীর কাকলী এলাকার নামকরণ৷
রাজধানীর বনানী-এয়ারপোর্ট রোডে কাকলী নামে যে বাসস্ট্যান্ড রয়েছে সেটা অনেকেই জানেন। সেখানে কাকলী নামে একটা রেস্টুরেন্ট ছিলো সেটাও অনেকে জানেন কিন্তু এই নামকরণের পেছনে যে সাহসিকতার ইতিহাস রয়েছে তা অনেকেই হয়তো জানেন না।

মূলত কাকলী নামের রেস্টুরেন্টের কারণে স্থানটি পরিচিত হয়ে ওঠে। আর কাকলী রেস্টুরেন্টটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এর মালিক শেখ ফেরদৌসী কাজল কাকলীর কারণে। সবাই তাকে কাকলী আপা নামে চেনে।

বনানীর শেখ ফেরদৌসী কাজল (কাকলী)। বঙ্গবন্ধু আর স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসের প্রতি বরাবরই টান তার। সময়টা ১৯৮৯ সাল। তখন বঙ্গবন্ধুর জীবনী নিয়ে শেখ রাসেল শিশু কিশোর সংসদ আয়োজিত একটি প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে প্রথম স্থান অধিকার করেন কাজল (কাকলী)।
তখনকার পরিচিত একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা হচ্ছে ‘সুগন্ধা’। আর সুগন্ধা পত্রিকার লেখক মুজাম্মেল হকের বাসা ছিলো বনানীতে। কাকলীর বাবা শেখ নুর মোহাম্মদের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক ছিলো সম্পাদকের।

সুগন্ধা পত্রিকায় কাকলীর একটি লেখা ‘তোমায় ভুলিনি হে জ্যোতির্ময় পিতা’ শিরোনামে ছাপা হয়েছিলো। এরপর থেকে কাকলী সুগন্ধায় নিয়মিতই লিখতেন এবং পড়তেন।

১৯৯০ সালের নভেম্বরের সুগন্ধার একটি সংখ্যাতে বঙ্গবন্ধুর খুনি কর্ণেল ফারুকের একটি লেখা ছাপা হয়। শিরোনাম ছিলো, ‘আমিই শেখ মুজিবকে হত্যা করেছি, সাহস থাকলে শেখ হাসিনা জিজ্ঞাসা করুক।’ এই লেখাটি দেখে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন কাকলী। সাইকেল চালিয়ে সোজা চলে যান কর্ণেল ফারুকের বাড়িতে। কলিং বেল চাপতেই লম্বা, ফর্সা একজন লোক এসে দরজা খুলে দিলো। বুঝতে বাকী রইল না যে তিনিই কর্ণেল ফারুক। ক্ষিপ্ত হয়ে কাকলী তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুই আমার বঙ্গবন্ধুকে কেন মারলি?’

কর্ণেল ফারুক কোনো জবাব দিলোনা, চুপ ছিলো। তারপর আবার তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুই আমার শেখ রাসেলকে কেন মারলি? তোকে আমি ফাঁসির কাষ্ঠে ঝোলাবো, তুই তাকিয়ে তাকিয়ে দেখবি।’

কর্ণেল ফারুক জবাব দিলো, ‘আপনি এখনো অনেক ছোট, বড় হলে বুঝবেন আমি কেন শেখ মুজিবকে মেরেছি!’
চিৎকার-চেঁচামেচি শুনে এরই মধ্যে কর্ণেল ফারুকের মা আসলেন এবং জিজ্ঞেস করলেন, ‘ও কে?’
তখন বঙ্গবন্ধুর খুনি কর্ণেল ফারুক বললেন, ‘ও বনানী স-মিল ও কাকলী মার্কেটের মালিক নুরু শেখের মেয়ে।’

এরপর কাকলী কর্ণেল ফারুকের মাকে বললেন, ‘এই ছেলেকে আপনি পেটে ধরেছেন?’ তিনিও কিছু না বলে মুচকি হাসি দিলেন।
খুনী কর্ণেল ফারুক তখন বললেন, ‘আপনি সাপ্তাহিক ‘সুগন্ধা’ ম্যাগাজিনে লেখেন, আমি আপনার প্রতিটা লেখা পড়ি। আপনি খুব ভালো লেখেন।’
সেখান থেকে বের হয়ে কাকলী দেখেন তার সাইকেল উধাও।  এরপর আবার চেঁচামেচি শুরু করলে কর্ণেল ফারুকের লোকজন সাইকেল বের করে দেয়। কাকলী সেখান থেকে সোজা বাসায় চলে যান৷

বাসায় এসেই কাকলীর তার বাবার সাথে দেখা, তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘মা মনি তুমি কোথায় গিয়েছিলে?’
সব শুনে কাকলীর বাবা বললেন, ‘যা ই করেছো মা ভালো করেছো, কিন্তু আমার তো সর্বনাশ হয়ে গেলো।’ কাকলী তখনও তার বাবার এ কথার অর্থ বুঝতে পারেননি, কিন্তু তা বুঝতে বেশি দেরিও হয়নি। কারণ, তার এক সপ্তাহের মধ্যেই কাকলীদের বনানী স-মিলে আগুন লাগিয়ে দেয়া হলো, ৬৫ টি দোকানসহ কাকলী মার্কেট ভেঙে গুড়িয়ে দেয়া হলো, এছাড়াও নানা ধরনের নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়েছিলো কাকলীর পরিবার।

এরপরের ঘটনা ২০০৯ সাল।  বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা নানা উত্থান-পতনের পর সর্বশেষ ২০০৯ সালে কর্ণেল ফারুকসহ আরো কয়েকজনের মৃত্যুদণ্ডের রায় দেয়া হয়।
রায় দেয়ার আগে কাকলী ভাবছিলেন, তিনি যদি কোর্টরুমে কোনভাবে থাকতে পারতেন। তাহলে সেদিনের সেই মুচকি হাসির জবাবটা তিনি চোখের চাহনীতেই কর্ণেল ফারুককে দিতে পারতেন!

অন্তত রায় পড়ার সময় তাকে থাকতেই হবে যে কোনো উপায়ে। অবশেষে তিনি থাকতে পেরেছিলেন কোর্টের তিন তলায়, যেখানে রায় পড়ে শোনানো হয়েছিল!

কোর্টে তিনি কর্ণেল ফারুককে দেখলেন আসামীর কাঠগড়ায়। কর্ণেল ফারুক কাকলীকে দেখে সেদিনও নাকি একটি মুচকি হাসি দিয়েছিল!
১৯৯০ সালের দিকে কাকলী মার্কেটের পাশাপাশি কাকলী রেস্টুরেন্টটিও খুব জনপ্রিয় ছিল। কর্ণেল ফারুকের নির্দেশে ঐ মার্কেট ভেঙ্গে ফেলার ঘটনাটি সেসময় ব্যাপক আলোচিত হয়েছিল!

আর এর মধ্যেই ওই এলাকার নাম হয়ে উঠেছিল কাকলী আপার ‘কাকলী’!

(তথ্যসূত্র ও ছবি : আন্তর্জাল)




সাতদিনের সেরা খবর

ফিচার - এর আরো খবর