কোটা সংস্কার আন্দোলনে হামলা-সংঘর্ষে নিহত ৬ 

গুলিবিদ্ধসহ বহু শিক্ষার্থী আহত, বিজিবি মোতায়েন 

নিজস্ব প্রতিবেদক

১৭ জুলাই, ২০২৪ ১১:১৫ পূর্বাহ্ন

কোটা সংস্কার আন্দোলনে হামলা-সংঘর্ষে নিহত ৬ 

কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘাতময় পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। আন্দোলনকারী, ছাত্রলীগ ও পুলিশের ত্রিমুখী রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ও হামলায় ছয়জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। গুলিবিদ্ধসহ আহত হয়েছেন বহু শিক্ষার্থী ও পথচারী। নিহতদের মধ্যে চট্টগ্রামে তিনজন, ঢাকায় দু’জন ও রংপুরের একজন রয়েছেন। এদিকে আন্দোলনকারীরা প্রথমে জানিয়েছিল, পবিত্র আশুরার কারণে বুধবার কর্মসূচি স্থগিত থাকবে। তবে রাতে তারা ঘোষণা দেয়, আজ দুপুরে রাজু ভাস্কর্যে গায়েবানা জানাজা ও কফিন মিছিল কর্মসূচি থাকছে।

গতকাল সকাল থেকেই রাজধানীর পথে পথে অবরোধ শুরু করেন শিক্ষার্থীরা। এতে যানচলাচল বন্ধ হয়ে যায়। রাজধানীর মহাখালীতে অবরোধের কারণে ঢাকার সঙ্গে সাত ঘণ্টা রেল যোগাযোগ বন্ধ ছিল। রাত সাড়ে ৮টার দিকে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে দুটি যাত্রীবাহী বাসে আগুন দেওয়া হয়। সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার পর ঘরে ফেরা কর্মজীবীরা পড়েন ভোগান্তিতে। 


এদিকে, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে সোমবার রাত থেকেই ব্যাপক সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। উপাচার্যের বাসভবনে আশ্রয় নেওয়া কোটা সংস্কার আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করে শাখা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীসহ বহিরাগতরা। পরে হল থেকে বের হওয়া শিক্ষার্থীদের ধাওয়া দিলে তারা ছত্রভঙ্গ হয়ে এলাকা ছাড়ে।

এ ছাড়া সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) বিভিন্ন আবাসিক হলে বিক্ষোভ করে ছাত্রলীগের কক্ষ ভাঙচুর করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলে আন্দোলনকারীরা ছাত্রলীগ সভাপতি ও সম্পাদকের কক্ষে তল্লাশিও চালান। 

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ঢাকা, গাজীপুর, চট্টগ্রাম, বগুড়া, রাজশাহী ও রংপুরে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) মোতায়েন করা হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে পুলিশ-র‍্যাবের পাশাপাশি বিজিবি টহল দিয়েছে। ঢাকাসহ সারাদেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা রয়েছেন সতর্ক প্রহরায়। রাত ১২টার দিকে নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অভিযান চালায় মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। এ সময় দলের সাত নেতাকর্মীকে আটক করা হয়। শতাধিক ককটেল এবং কয়েকটি দেশি-বিদেশি অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। এর আগে সকালে সংবাদ সম্মেলনে ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব বলেন, ছাত্রদল সর্বাত্মকভাবে শিক্ষার্থীদের চলমান আন্দোলনের পাশে রয়েছে। 

এদিকে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার প্রেক্ষাপটে দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল, টেক্সটাইল, ইঞ্জিনিয়ারিং এবং অন্যান্য কলেজ বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। দেওয়া হয়েছে হলত্যাগের নির্দেশ। এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শ্রেণি কার্যক্রম পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বন্ধ থাকবে। বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠেয় সব শিক্ষা বোর্ডের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। 

আন্দোলনরত শিক্ষার্থীর ওপর গেল সোমবার হামলার প্রতিবাদে মঙ্গলবার রাজধানীর বেশ কয়েকটি এলাকার সড়ক আটকে বিক্ষোভ করেন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। সায়েন্স ল্যাবরেটরি ও নিউমার্কেট এলাকায় সংঘর্ষ হয়েছে দফায় দফায়। ক্ষমতাসীন দলের সমর্থক ও কোটা সংস্কারে আন্দোলনরত শিক্ষার্থী– উভয় পক্ষের হাতে ছিল লাঠিসোটা ও দেশি অস্ত্রশস্ত্র। কারও হাতে আগ্নেয়াস্ত্রও দেখা যায়। বিকেল ৫টার দিকে ঢাকা কলেজের সামনে থেকে আহত এক যুবককে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। তাঁর মাথা ও মুখে জখমের চিহ্ন ছিল। পরে আঙুলের ছাপের মাধ্যমে মধ্যরাতে পরিচয় শনাক্ত হয়। তাঁর নাম সবুজ আলী (২৪)। ওই যুবকের গ্রামের বাড়ি নীলফামারী সদরে। সন্ধ্যা ৭টার দিকে ধানমন্ডির পপুলার হাসপাতাল থেকে আহত আরেকজনকে ঢামেকে নেওয়া হলে মৃত ঘোষণা করা হয়। যারা তাঁকে হাসপাতালে নিয়েছেন তাঁরা জানান, ওই তরুণ সিটি কলেজের সামনে আহত হন। তাঁর মাথায় আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। 

ঢামেক পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ বাচ্চু মিয়া বলেন, পপুলার থেকে যে যুবককে ঢামেকে আনা হয়েছে, রাতে তাঁর পরিচয় শনাক্ত করেছেন স্বজনরা। মো. শাহজাহান (২৪) নামে ওই যুবক স্ত্রী ও পরিবারের সদস্যদের নিয়ে কামরাঙ্গীরচর থাকতেন। তিনি পেশায় হকার। 
শাহজাহানের মা আয়শা বেগম বলেন, নিউমার্কেটের বলাকা সিনেমা হলের সামনে পাপোশ বিক্রি করত আমার ছেলে। কীভাবে মারা গেছে, জানি না। 

চট্টগ্রামে নিহত তিনজনের মধ্যে দু’জনের পরিচয় মিলেছে। তাঁরা হলেন মো. ফারুক (৩২) ও মো. ওয়াসিম (২২)। ফারুক একটি আসবাবের দোকানের কর্মচারী। তাঁর শরীরে গুলির চিহ্ন রয়েছে। ওয়াসিম চট্টগ্রাম কলেজ শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক।

রংপুরে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীর সঙ্গে পুলিশ ও ছাত্রলীগের সংঘর্ষে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ (২২) নিহত হয়েছেন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের কোটা আন্দোলন সমন্বয় কমিটির সদস্য ছিলেন। সাঈদের মৃত্যুর ঘটনার জেরে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বাসভবন ও সেখানে থাকা কয়েকটি গাড়িতে আগুন দেন বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা। 

এদিকে রাজধানীর ধানমন্ডি, মিরপুর-১০, মিরপুর-১৪, মেরুল বাড্ডা, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার সামনে, যাত্রাবাড়ীর কাজলা, বিমানবন্দর গোলচত্বর, শান্তিনগর, মতিঝিল শাপলা চত্বর, উত্তরা, মহাখালীসহ আরও কয়েকটি এলাকায় বিক্ষোভ হয়েছে। এতে সড়কগুলোতে যান চলাচল বন্ধ হলে ভোগান্তিতে পড়েন অনেকে। মহাখালীতে দুপুরের দিকে রেললাইন অবরোধ করেন শিক্ষার্থীরা। এতে দেশের বিভিন্ন এলাকার সঙ্গে রাজধানীর রেল যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। রাত ৮টার দিকে রেল চলাচল স্বাভাবিক হয়। 

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় শিক্ষার্থী, ছাত্রলীগ নেতাকর্মীসহ আহত ১২৬ জনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। আটজন ছাড়া বাকি সবাই প্রাথমিক চিকিৎসার পর হাসপাতাল ছেড়েছেন। সংঘর্ষে আহত হন ১২ পুলিশ সদস্য। 

কোটা আন্দোলনকে বিএনপি-জামায়াত সরকার পতন আন্দোলনে রূপ দেয়ার ষড়যন্ত্র করছে বলে সরকারের মন্ত্রীরা মন্তব্য করেছেন। সরকার কঠোরভাবে এসব অপচেষ্টা মোকাবেলা করবে বলেও জানান তারা।




সাতদিনের সেরা খবর

জাতীয় - এর আরো খবর

জামায়াতের ইফতারে প্রধানমন্ত্রীকে দাওয়াত

জামায়াতের ইফতারে প্রধানমন্ত্রীকে দাওয়াত

১৭ জুলাই, ২০২৪ ১১:১৫ পূর্বাহ্ন

তিন মন্ত্রণালয়ে সচিবের দায়িত্বে রদবদল

তিন মন্ত্রণালয়ে সচিবের দায়িত্বে রদবদল

১৭ জুলাই, ২০২৪ ১১:১৫ পূর্বাহ্ন