পিরোজপুর-২ (ভান্ডারিয়া, কাউখালি, নেছারাবাদ) আসনের ৩৮ বছরের সাম্রাজ্যের ইতি ঘটলো বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ জাতীয় পার্টি (জেপি) চেয়ারম্যান ৭ বারের সংসদ সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর। এই আসনে নতুন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর সাম্রাজ্য দখলে নিলেন পিরোজপুর জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং সাবেক জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও প্রশাসক মো. মহিউদ্দিন মহারাজ।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মহারাজ প্রথমবার নির্বাচনে এসেই বাজিমাত করে দিয়েছেন। আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর দুর্গ ভেঙ্গে তছনছ করে দিলেন। স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েও মহিউদ্দিন মহরাজ নির্বাচনী এলাকার তিনটি উপজেলাতেই বিপুল ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেছেন আওয়ামী লীগের শরিক দল জাতীয় পার্টি (জেপি) চেয়ারম্যান নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচনী মাঠে আসা আনোয়ার হোসেন মঞ্জুকে।
গত ৭ জানুয়ারী অনুষ্ঠিত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বেসরকারী ফলাফলে দেখা গেছে-পিরোজপুর-২ আসনের নির্বাচনী এলাকার তিন উপজেলা মিলিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মহিউদ্দিন মহারাজ ঈগল প্রতীক নিয়ে পেয়েছেন ৯৯ হাজার ২৬৮ ভোট। প্রতিদ্ব›দ্বী নৌকা প্রতীক নিয়ে জাতীয় পার্টির (জেপি) চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু পেয়েছেন ৭০ হাজার ৬৮১ ভোট।
পিরোজপুর-২ আসনের ৭ বারের সংসদ সদস্য জাতীয় পার্টি (জেপির) চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু। টানা ১৪ বছর মন্ত্রী ছিলেন বর্ষীয়ান এই রাজনীতিবিদ। তার সময়ে এলাকায় ব্যাপক উন্নয়ন হওয়ায় প্রায় চার দশক ধরে ছিলেন অপ্রতিদ্ব›দ্বী। তবে কয়েকবছর ধরে তাকে শক্ত চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছেন তারই সাবেক পিএস ও শিষ্য মহিউদ্দিন মহারাজ। এবার জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আনোয়ার হোসেন মঞ্জুকে হারতে হয়েছে তার সেই শিষ্যের কাছেই।
নির্বাচনের শুরু থেকেই হারের শঙ্কায় ছিলেন প্রবীণ রাজনীতিক আনোয়ার হোসেন মঞ্জু। নিশ্চিত হার ঠেকাতে নিজের প্রতীক বাইসাইকেল বিসর্জন দিয়ে উঠেছিলেন নৌকায়। কিন্তু ভান্ডারিয়া, কাউখালী এবং নেছারাবাদ এই তিন উপজেলার ৯০ শতাংশ আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গসহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীসহ তিনি উপজেলার প্রায় সকল জনপ্রতিনিধি মহারাজকে জেতাতে মাঠ চষে বেড়ান। জনপ্রতিনিধি ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের এই আবেগকে মূল্যায়ন না করে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক কানাই লাল বিশ্বাস নিজ জেলা কমিটির যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মহিউদ্দিন মহারাজকে হারাতে জেপি চেয়ারম্যান মঞ্জুর পক্ষে মরিয়া হয়ে মাঠে নামেন। আওয়ামী লীগের যেসব নেতাকর্মী ও জনপ্রতিনিধি নৌকার বিরোধিতা করে স্বতন্ত্র প্রার্থীর পক্ষে কাজ করছেন তাদেরকে দল থেকে বহিষ্কারের হুমকিও দিয়েছিলেন কানাই লাল বিশ্বাস। অবশ্য তাতেও ভোটের মাঠে রক্ষা হলো না মঞ্জুর। উল্টো মঞ্জুর দলের (জেপি) অনেক নেতাকর্মী মহারাজের সাথে প্রচার প্রচারণায় থেকে তাকে (মহারাজ) জেতাতে সহযোগিতা করেছেন।
নির্বাচনের আগ থেকেই পুরো সংসদীয় আসনের প্রায় শতভাগ জনপ্রতিনিধি স্বতন্ত্র প্রার্থী মহিউদ্দিন মহারাজের সঙ্গে জোট বেঁধেছিলেন। পিরোজপুর-২ আসনে তিন উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও দুইটি পৌরসভার মেয়র মহারাজের পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণায় দিনরাত পরিশ্রম করেন। এছাড়া তিন উপজেলায় থাকা ২১টি ইউনিয়নের মধ্যে ২০টি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানবৃন্দ ঈগল প্রতীকের প্রার্থী মহারাজের পক্ষে কাজ করেছেন। তিন উপজেলা পরিষদের সাধারণ ও সংরক্ষিত ভাইস চেয়ারম্যানের ৪জনই ছিলেন ঈগলের পক্ষে। এছাড়া ২১টি উনিয়ন পরিষদের প্রায় সকল মেম্বার কাজ করেছেন মহারাজের পক্ষে। এই নির্বাচনে আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর জেপির নেতাকর্মীদেরও একটি বড় অংশ মহিউদ্দিনকে সমর্থন দিয়ে মাঠে ঘাটে সরব ভূমিকা পালন করেছেন।
নির্বাচনী এলাকার তিন উপজেলার মধ্যে ভান্ডারিয়া উপজেলায় আনোয়ার হোসেন মঞ্জু (নৌকা) পেয়েছেন ২৬,০৬১ ভোট। আর মহিউদ্দিন মহারাজ পেয়েছেন ৪০,৬০৭ ভোট। এই উপজেলায় ১৪ হাজার ৫৬৪ ভোট বেশি পান মহারাজ। এ উপজেলায় সবচেয়ে চমক ছিল মহারাজের নিজের বাড়ির এলাকার ৩নং তেলিখালী ইউনিয়নে। এখানকার ভোটাররা একজোট হয়ে মহিউদ্দিন মহারাজের ঈগল প্রতীকে ভোট দিয়েছেন।
তেলিখালি ইউনিয়নের ৯টি ওয়ার্ডের প্রাপ্ত ফলাফলে দেখা গেছে, ঈগল প্রতীকে মহিউদ্দিন মহারাজ পেয়েছেন ১৫,০০৪ ভোট। অন্যদিকে, একাধিকবারের সংসদ সদস্য, সাবেক মন্ত্রী প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ আনোয়ার হোসেন মঞ্জু পেয়েছেন মাত্র ৪৯ ভোট।
কাউখালী উপজেলায়ও আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর চেয়ে মহিউদ্দিন মহারাজ প্রায় সাড়ে তিন হাজার ভোট বেশি পেয়েছেন। এখানকার প্রাপ্ত ফলাফলে মহারাজের ঈগল প্রতীক পেয়েছে ১৩,২৭০ ভোট। অন্যদিকে আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর নৌকা প্রতীকে পেয়েছেন ৯,৮৭৪ ভোট।
নির্বাচনী এলাকার অপর উপজেলা নেছারাবাদ (স্বরূপকাঠী) উপজেলায় ঈগল প্রতীক নিয়ে মহিউদ্দিন মহারাজ পেয়েছেন ৪৫,৮৪৭ ভোট। অন্যদিকে, নৌকা নিয়ে জেপির চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু পেয়েছেন ৩৪,৩৯৮ ভোট। এখানে নৌকার থেকে ঈগল বেশি পেয়েছে ১১,৪৪৯ ভোট।
উল্লেখ্য, ২০১৬ সালের জেলা পরিষদের প্রথম নির্বাচনেও মহিউদ্দিন মহারাজ স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করে বিপুল ভোটে জয়লাভ করেছিলেন। ওই সময় তার প্রতিদ্ব›দ্বী প্রার্থী ছিলেন আওয়ামী লীগ সমর্থিত পিরোজপুর-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ মোঃ শাহ আলম। জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের পরে মহিউদ্দিন মহারাজ সরকার মনোনীত জেরা পরিষদের প্রশাসক নিযুক্ত হন।
মহিউদ্দিন মহারাজের বাবা মরহুম শাহাদাৎ হোসেন ছিলেন তেলীখালী ইউনিয়নের একাধিকবারের নির্বাচিত চেয়ারম্যান। তার মেঝ ভাই মিরাজুল ইসলাম ভান্ডারিয়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। আরেক ভাই শামছুদ্দীন তেলীখালী ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি। আরেক ভাই সালাউদ্দিন ব্যবসায়ী।