ভোটের মাঠে ‘হঠাৎ সাংবাদিক’

এস এম-নুর, পিরোজপুর প্রতিনিধি

৬ জানুয়ারী, ২০২৪ ১২:৫৪ পূর্বাহ্ন

ভোটের মাঠে ‘হঠাৎ সাংবাদিক’

ভোটের মাঠে ‘হঠাৎ সাংবাদিক’
নির্বাচন এলেই সাংবাদিক নন, এমন কিছু ব্যক্তি এক দিনের জন্য (ভোটের দিন) সাংবাদিক হওয়ার মতো অপতৎপরতা চালান। কখনো বা সফল হয়েও যান! কৌশলে ইসির অনুমোদিত সাংবাদিক আইডি কার্ডসহ যানবাহনের স্টিকারও তারা বাগিয়ে নেন। কোনো দলীয় এজেন্ডা বাস্তবায়নে নির্বাচনকে নানাভাবে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেন। কিন্তু বিগত বেশ কিছু নির্বাচনে সে রকম কিছু ঘটনা ঘটেছে। এতে ক্ষুণ্ন হচ্ছে প্রকৃত পেশাদার সাংবাদিকদের ভাবমূর্তি। উদাহরণ হিসেবে কয়েকটি ঘটনা উল্লেখ করা যেতে পারে।

২০১৪ সালে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটের পরদিন ৬ জানুয়ারি একটি গণমাধ্যমের তথ্য বলছে, “চুয়াডাঙ্গার দুটি নির্বাচনী এলাকায় নির্বাচন পর্যবেক্ষণের জন্য ১৫৫টি ‘সাংবাদিক’ কার্ড দেওয়া হয়েছে। এসব কার্ডধারী কখনো কোনো পত্রিকায় কাজ না করলেও নির্বাচনী মাঠে ‘হঠাৎ সাংবাদিক’ হয়ে যান। কার্ডধারী এসব ব্যক্তির বেশির ভাগই সরাসরি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত।”

ওই ঘটনায় নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সংশ্লিষ্ট সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা সে সময় জানান, রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা নামসর্বস্ব পত্রিকার পরিচয়পত্র জমা দিয়ে নির্বাচন কমিশনের এই কার্ড তারা সংগ্রহ করেছেন। নিয়েছেন যানবাহন ব্যবহারের অনুমতিও। ‘হঠাৎ সাংবাদিক’ বনে যাওয়া ওই ব্যক্তিদের গলায় প্রেসকার্ড ঝুলিয়ে দলীয় প্রার্থীর পক্ষে প্রচার চালাতেও দেখা গেছে। ২০২২ সালের ২৯ ডিসেম্বর সপ্তম ধাপের ইউপি নির্বাচনেও একই ধরনের ঘটনা ঘটতে দেখা গেছে।


২০২১ সালে অপর একটি গণমাধ্যমের তথ্য বলছে, ওই বছরের ৩১ জানুয়ারি ফেনী পৌরসভা নির্বাচনে ভোটের দিন ‘ফেনীতে আওয়ামী লীগ নেতাদের গলায় সাংবাদিক কার্ড’ শিরোনামে খবর প্রকাশিত হয়। সেদিন ইউনিয়ন পর্যায়ের দলীয় অনেক নেতার গলায়ও সাংবাদিক কার্ড দেখা যায়। অভিযোগ ওঠে, তারা বিভিন্ন পত্রিকার সাংবাদিক পরিচয়ে এই কার্ড গলায় ঝুলিয়ে ভোটকেন্দ্র দখল এবং প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেছেন।

এসব ঘটনা শুধু জেলা পর্যায়ে নয়, ঢাকার বিভিন্ন নির্বাচনেও আমরা পর্যবেক্ষণ করেছি। কারণ ব্যাঙের ছাতার মতো রাজধানীতেও হঠাৎ গজিয়ে উঠেছে ভুঁইফোঁড় নানা গণমাধ্যম। সেসব প্রতিষ্ঠানের সাংবাদিক পরিচয়ে তাৎক্ষণিক আইডি কার্ড বানিয়ে, অনেক দিন ধরে প্রকাশনা বন্ধ আছে এমন সব পত্রিকা এবং অনলাইন নিউজ পোর্টালের পরিচয় দিয়ে সাংবাদিক কার্ড নিয়ে ভোটের মাঠে গিয়ে অসাংবাদিকসুলভ নানা ধরনের ঘটনা ঘটিয়ে থাকেন।

জাতীয় নির্বাচনসহ যেকোনো নির্বাচনে ভোটের মাঠে ওয়াচডগের ভূমিকা পালন করে থাকেন সাংবাদিকরা। নির্বাচনের প্রতিটি কার্যক্রমই গণমাধ্যমের কর্মীরা পর্যবেক্ষণ ও প্রচার করে থাকেন। ভোটের দিন সংবাদ সংগ্রহ করতে হলে একজন সাংবাদিককে অবশ্যই নির্বাচন কমিশন অনুমোদিত আইডি কার্ড নিতে হয়। সেই আইডি কার্ড ছাড়া তার মাঠ পর্যায়ে সংবাদ সংগ্রহ করার অধিকার নেই। তেমনিভাবে পেশায় সাংবাদিক নন, এমন ব্যক্তিদের ইসির আইডি কার্ড পাওয়া নিয়ে বিভিন্ন মহলে সমালোচনাও হয়েছে।

ভোটের মাঠে সাংবাদিক পরিচয়ে এ ধরনের অনিয়ম ও অরাজকতার জন্য ইসির অব্যবস্থাপনাকে দায়ী করেছেন সিনিয়র সাংবাদিকরা। দীর্ঘদিন নির্বাচন কমিশন বিটে দায়িত্বরত সিনিয়র সাংবাদিক অনলাইনের সম্পাদক এবং খুলনা বিভাগীয় সাংবাদিক ফোরাম-ঢাকার সভাপতি শেখ নজরুল ইসলাম বলেছেন, ‘এটা অনেক পুরোনো সমস্যা হলেও বর্তমানে এর ব্যাপকতা বেড়েছে। এ বিষয়ে ইসি যেটা করতে পারে সেটা হলো তারা ক্যাটাগরিভিত্তিক কোন কোন গণমাধ্যমের কতজনকে কার্ড দেবেন তার একটা তালিকা করা, যেটা হয় না। ভোটের আগে শেষ পর্যায়ে মাত্র ১৫ দিনে এই কাজ সুষ্ঠুভাবে করা কঠিন। ইসির ভোটের প্রস্তুতিমূলক আগাম এই কাজ এক মাস আগে শুরু হলে অসুবিধা কোথায়! গণমাধ্যমের তথ্য সঠিকভাবে যাচাই-বাছাইয়ের জন্য প্রয়োজনে জনবল বাড়ানো যেতে পারে। আর মিডিয়া হাউসগুলোরও আগাম পরিকল্পনায় ঘাটতি রয়েছে। তাদেরও উচিত এ ব্যাপারে ইসিকে সহযোগিতা করা।’

নির্বাচনের সময় সাংবাদিক কার্ড বিতরণ ব্যবস্থাপনা প্রসঙ্গে ইসির সাবেক জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আসাদুজ্জামান আরজু বলেন, ‘নিয়মনীতির বাইরে কাউকেই সাংবাদিক আইডি কার্ড দেওয়া উচিত নয়। কারণ সম্প্রতি ভার্চুয়াল দুনিয়ায় অসংখ্য নিউজ পোর্টালের আবির্ভাব হয়েছে। তার মধ্যে যেসব নিউজ পোর্টাল তথ্য মন্ত্রণালয়ের নিবন্ধন পেয়েছে, সেসব পোর্টালের সাংবাদিকরাই শুধু ইসির আইডি কার্ড পাবেন। এদিকে এখনো নিবন্ধনের বাইরে কার্যক্রম চালাচ্ছে অনেক অনলাইন নিউজ পোর্টাল। তারাও নির্বাচনের দিন মাঠে কাজ করার অনুমতি চায়। কিন্তু তাদের কার্ড দেওয়ার নিয়ম নেই। কিন্তু তার পরও নির্বাচনের সময় অনুমোদন থাক বা না থাক, সব ধরনের গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা ভোটের মাঠে কাজ করতে সাংবাদিক আইডি কার্ড পাওয়ার জন্য নানা ধরনের তৎপরতা করেন। অনেক সময় চাপ সামাল দিতে হিমশিমও খেতে হয়। আর সময় বাড়ানোর যে কথাটা উঠেছে, সে বিষয়ে আমি ভিন্নমত পোষণ করি। কারণ বিগত দিনেও দেখেছি এই কার্ড ইস্যু কার্যক্রমে সময় বাড়িয়ে দিয়েও কোনো লাভ হয় না। তাতে বরং অপব্যবহারের ঝুঁকি বাড়ে। এ ছাড়া বেশির ভাগ গণমাধ্যম থেকেই প্রথম দিকে আবেদন করা হয় না। বেশি আবেদনপত্র জমা পড়ে শেষ পাঁচ দিনে।’

আসছে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটের দিন এবার কতজন সাংবাদিক মাঠে দায়িত্ব পালনের জন্য ইসির অনুমতি পাবেন, কার্ড ব্যবস্থাপনায় অসংগতিগুলো দূর হবে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এ বিষয়ে ইসির পরিকল্পনা জানতে ইসি জনসংযোগ বিভাগের পরিচালক মো. শরিফুল আলমের সঙ্গে কথা বলেছে  আমাদের প্রতিনিধি। তিনি বলেন, ‘ভোটের মাঠে সংবাদ সংগ্রহের জন্য কারা ইসির সাংবাদিক আইডি কার্ড ও স্টিকার পাবেন, এ ব্যাপারের ইসির সুস্পষ্ট নীতিমালা রয়েছে। সেই নীতির আলোকে মূলধারার গণমাধ্যমের সাংবাদিকদের ইসির অনুমোদিত আইডি কার্ড দেওয়া হবে। সাংবাদিক নন এমন কোনো ব্যক্তির হাতে যাতে এই কার্ড না যায়, অর্থাৎ কার্ড বিতরণে অনিয়ম যাতে না হয়, সে ব্যাপারে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা হবে। পিআইডি থেকে মিডিয়া লিস্ট দেখে শুধু সরকার অনুমোদিত গণমাধ্যমের সাংবাদিকদের এই কার্ড দেওয়া হবে। এ ছাড়া এমন কিছু পুরোনো পত্রিকা আছে, যেসব বর্তমানে বাজারে প্রকাশ হয় কি হয় না, তাদের ক্ষেত্রে আমরা সেটা প্রমাণের জন্য আবেদনপত্রের সঙ্গে বিগত এক সপ্তাহের পত্রিকার কপি জমা দিতে বলি। যাতে ভুয়া সাংবাদিকরা মাঠে যাওয়ার সুযোগ না পান। আবেদনের তথ্য-উপাত্ত সঠিকভাবে যাচাই না করে এবার কোনো সাংবাদিককেই ইসির কার্ড দেওয়া হবে না।’

গণমাধ্যমের আবেদনগুলো যাচাই-বাছাইয়ের মূল দায়িত্ব পালন করেন ইসির জনসংযোগ বিভাগের সহকারী পরিচালক মো. আশাদুল হক। তিনি বলেন, ‘অন্যান্য নির্বাচনে ভোটের মাত্র তিন-চার দিন আগে আমরা সাংবাদিকদের কার্ড ইস্যু করা শুরু করি। তবে জাতীয় নির্বাচনের সময় ১০ হাজারেরও বেশি সাংবাদিক ইসির অনুমোদিত কার্ড নিয়ে থাকেন। এ ক্ষেত্রে চাপও বেশি থাকে। তাই ভোটের ১০ দিন আগেই ঘোষণা দিয়ে ইসির কার্ড বিতরণের কাজ আমরা শুরু করি। আমরা যাচাই করে কার্ড দেওয়ার চেষ্টা করি, কিন্তু এ ক্ষেত্রে জনবলের সংকট আছে। কিন্তু তার চেয়েও বড় সমস্যা হলো শেষ পাঁচ অথবা তিন দিনে কার্ডের জন্য সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়েন। অথচ প্রথম দিকে বেশির ভাগ গণমাধ্যম থেকেই নানা অজুহাতে কার্ডের জন্য আবেদন করা হয় না। তবে প্রতিষ্ঠিত গণমাধ্যমের ক্ষেত্রে আমাদের বেশি যাচাইয়ের দরকার হয় না। সমস্যায় পড়তে হয় আন্ডারগ্রাউন্ড গণমাধ্যমগুলো নিয়ে। ওই সময়ে তাদের চাপ এত বেশি থাকে যে, এত কম জনবল দিয়ে তা যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়ে।’

ইসির জনসংযোগ কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘পরিস্থিতি সামাল দিতে এবার নিজস্ব কর্মকর্তা বাড়ানোসহ পিআইডি থেকে অন্তত চারজন কর্মকর্তা আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তাদের সেকশনভিত্তিক গণমাধ্যমের দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়া হবে, যাতে তথ্য বাছাই করা সহজ হয়। নীতিমালা মেনে সাংবাদিকদের আইডি কার্ড বিতরণে জেলা এবং থানা পর্যায়ের নির্বাচন কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে।


মুল লেখক:-শাহনাজ পারভীন এলিস




সাতদিনের সেরা খবর

সারাদেশ - এর আরো খবর

যে কারণে পুলিশকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার নির্দেশ

যে কারণে পুলিশকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার নির্দেশ

৬ জানুয়ারী, ২০২৪ ১২:৫৪ পূর্বাহ্ন

যে কারণে ৭ দিন বন্ধ সোনাহাট স্থলবন্দর!

যে কারণে ৭ দিন বন্ধ সোনাহাট স্থলবন্দর!

৬ জানুয়ারী, ২০২৪ ১২:৫৪ পূর্বাহ্ন

 সরাইলে তিতাস নদীতে নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতার আয়োজন

সরাইলে তিতাস নদীতে নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতার আয়োজন

৬ জানুয়ারী, ২০২৪ ১২:৫৪ পূর্বাহ্ন

খুলনায় ১০৩ কেজি হরিণের মাংসসহ যে ভাবে শিকারি আটক!

খুলনায় ১০৩ কেজি হরিণের মাংসসহ যে ভাবে শিকারি আটক!

৬ জানুয়ারী, ২০২৪ ১২:৫৪ পূর্বাহ্ন