রেজাউল করিম খোকন: বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা এখন বিশ্বের অন্যতম যানজটের শহরে পরিণত হয়েছে। যানজট এখন নগরবাসীর নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠেছে, যানজট ছাড়া সপ্তাহের কোনো একটি দিনের কথা কল্পনা করতে পারে না কেউ। আজকাল ছুটির দিনে ঘরের বাইরে বেরুলেও যানজটের কবলে পড়তে হচ্ছে। যানজটের কবলে পড়ে সবার জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে দিনে দিনে। যে কারণে জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কোথাও যাওয়ার চিন্তাভাবনা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলছেন কেউ কেউ। যারা পারছেন না, তারা যানজটের অভিশাপ মাথায় নিয়ে রাস্তায় চলাফেরা করছেন এবং প্রতিদিনই নারকীয় অভিজ্ঞতার নিত্যনতুন রূপ দেখছেন। বিভিন্ন পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, রাজধানীর যানজটই খেয়ে ফেলছে জিডিপির বড় একটি অংশ। সবকিছুর গতি শ্লথকারী এই যানজট দূর করা গেলে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় বাড়ত আরও। শুধু আর্থিক বিচারেই নয়, যে পরিমাণ ভোগান্তি, আয়ুক্ষয় ও নৈরাজ্য যানজট তৈরি করে, তা জাতীয় জীবনে এক অপূরণীয় ক্ষতি আর ব্যক্তির জন্য তা এক অভিশাপ। যানজট হচ্ছে- রাস্তার এমন এক অবস্থা, যেখানে যানবাহনের গতি কমে যায়, যাতায়াতের সময় অযাচিতভাবে বেড়ে যায় এবং যানবাহনের ‘কিউ’ বেড়ে যায়, অর্থাৎ সমগ্র রাস্তা অপেক্ষমাণ অথবা ধীরগতিসম্পন্ন যানবাহনে ঠাঁসা থাকে। যানজট গাড়িচালকদের হতাশা এবং ‘রোড রেজ’-এ আক্রান্ত করে। ‘রোড রেজ’ হচ্ছে- গাড়ি চালকদের রাগান্বিত আচরণ বা উদ্ধত আচরণ। রাস্তায় দুর্ঘটনার মূলত এটি অন্যতম কারণ। বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার রাস্তায় যানজট একদশক আগেও এতোটা তীব্র ছিল না। দিনে দিনে এখানে যানজট এতটা তীব্র হয়ে উঠছে, যে কারণে অচল শহরে পরিণত হতে চলেছে ঢাকা। যানজট অবসানে সবাই সোচ্চার দাবি জানালেও পরিস্থিতির তেমন কোনো উন্নয়ন হচ্ছে না, ঢাকা শহরে গত দশবছরে অনেকগুলো উড়াল সেতু বা ফ্লাইওভার চালু করা হয়েছে বটে, এর মাধ্যমে যানজট কমবে আশা করা হলেও প্রত্যাশা অনুযায়ী যানজট পরিস্থিতির তেমন কোনো উন্নয়ন হয়নি, সরকারি মহল থেকেও যানজট দূরীকরণে নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে। কিন্তু নির্মম সত্যি হলো, কোনো সরকারই যানজটের অভিশাপ দূর করার ব্যাপারে আন্তরিকভাবে সচেষ্ট তা বলা যায় না। প্রকল্পের পর প্রকল্প আসে, অনেক টাকা ব্যয় হয়, কিন্তু সমস্যার তিমির আর দূর হয় না। ক্ষোভের সঙ্গে বলতে হয়, অনেক ক্ষেত্রে সরকার নানাভাবে যানজটের ভয়াবহ এই সমস্যা জিইয়ে রাখছে। যানজটের আর্থিক ক্ষতির হিসাবের মধ্যে সময়ের অপচয়, দেরির কারণে আনুসঙ্গিক ব্যয় বৃদ্ধি, পরিবেশগত ক্ষতি এবং দুর্ঘটনার কারণে জীবনহানি পঙ্গুত্ব বরণের বিষয়গুলো উল্লেখ করতেই হয়। যানজটে সবচেয়ে বড় ক্ষতিটা হলো মানবিক। আক্ষেপের সঙ্গে বলতে হয়, এ শহরের অধিবাসীদের জীবনের অনেক মূল্যবান কিছু বছর চলে যায়, শুধু রাস্তা থেমে থাকা গাড়িতে বসে অপেক্ষা করতে করতে। হয়তো এ সময় কাজে লাগিয়ে তারা জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারতেন। উন্নত বিশ্বের নাগরিকদের তুলনায় সর্বক্ষেত্রে আমরা যে পিছিয়ে পড়ছি, তার অন্যতম কারণ; কিন্তু এই যানজট। এটা মানতেই হবে যানজটে কেউ খুশি হয় না বরং অসহিষ্ণু আচরণ করে। যানজট মানুষের মনে স্ট্রেস সৃষ্টি করে, এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় মালামাল পরিবহনে বিঘœ ঘটে, প্রচুর সময় লাগে, পরিবহন ব্যয় বেড়ে যায় এর ফলে। এর ফলে ব্যবসা-বাণিজ্যে বিরূপ প্রভাব পড়ছে আবশ্যিকভাবে। আজকাল ঢাকা শহরে আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধবদের বাড়িতে বেড়াতে যাওয়া আসা অনেকে কমিয়ে দিয়েছেন, এই যানজটের কারণে। বিয়েশাদির দাওয়াত পেলে অনেকেই বিব্রত বোধ করেন। কারণ যানজট অতিক্রম করে বিয়েশাদির কিংবা অন্যান্য দাওয়াতে সময় মতো পৌঁছানোটা রীতিমতো চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে এখন। এভাবেই সামাজিক সম্পর্ক, পারিবারিক সম্পর্ক অনেকটাই হালকা হয়ে যাচ্ছে, নিয়মিত যাওয়া-আসা না থাকার কারণে। যানজট পারিবারিক সামাজিক বন্ধন অটুট রাখার পথে বড় ধরনের বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে, আমরা সবাই অসহায়ভাবে যানজটের কাছে জিম্মি হয়ে পড়ছি।
আমাদের প্রাত্যহিক জনজীবনে এক অসহনীয় সমস্যা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে যানজট। দিনে দিনে এ সমস্যা প্রকট হচ্ছে। যানজট থেকে মুক্তির বিভিন্ন উপায় খুঁজছেন সবাই। যানজটের কারণে অর্থনৈতিক উন্নয়ন নানাভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকাকে এখন যানজটের শহর হিসেবে বিবেচনা করছেন সবাই। ঘর থেকে বের হয়ে নির্দিষ্ট সময়ে গন্তব্যে পৌঁছার কোনো নিশ্চয়তা নেই কারও। কর্মস্থলে যাওয়ার পথেই নষ্ট হচ্ছে, অনেকের মূল্যবান শ্রমঘণ্টা। রাজধানীর অসহনীয় যানজট অর্থনীতিতে বিপুলভাবে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তবে বর্তমান বিশ্বে শুধু ঢাকা শহর কিংবা বাংলাদেশেই নয়, উন্নত বিশ্বের অনেক দেশেই উন্নত ট্রাফিক ব্যবস্থা থাকার পরেও মাঝেমধ্যে যানজটের কবলে পড়ছেন বড় বড় শহরের পথচলা মানুষ, সেই সঙ্গে পণ্যবাহী গাড়ি। যানজটের বিরূপ প্রভাবও সেসব দেশের অর্থনীতিতে নানাভাবে বিপর্যয় সৃষ্টি করছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এটা মারাত্মক প্রভাব ফেলছে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে। শুধু আর্থিক বিচারেই নয়, যে পরিমাণ ভোগান্তি, আয়ুক্ষয় ও নৈরাজ্য সৃষ্টি করে যানজট। তা জাতীয় জীবনে এক অপূরণীয় ক্ষতি, আর ব্যক্তির জন্য এক অভিশাপও। যানজটের আর্থিক ক্ষতির হিসাবের মধ্যে সময়ের অপচয়, দেরির কারণে আনুষঙ্গিক ব্যয় বৃদ্ধি পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি এবং সেই সঙ্গে দুর্ঘটনার খতিয়ানও যুক্ত হচ্ছে। শহরে যারা প্রতিদিন চাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্য, পড়াশোনার জন্য ঘর থেকে বাইরে বের হন, তাদের জীবনের অনেকটা মূল্যবান সময় চলে যায়, শুধু যানজটে আটকা পড়ে অযথা অপেক্ষা করে। এ সময়টা যদি যথার্থভাবে কাজে লাগানো যেত, তাহলে গোটা অর্থনীতিতে এক ধরনের বিশেষ গতির সঞ্চার হতো। অনেক মানুষ যানজটের কারণে সৃষ্ট নানা জটিলতার কারণে চাকরি এবং ব্যবসার ধরন এবং স্থান পরিবর্তন করছেন। এমনও দেখা যাচ্ছে, গাড়ির জন্য রাস্তায় অপেক্ষা করে অনেকেই তাদের মূল্যবান সময় অপচয় করছেন অনিচ্ছা সত্ত্বেও।
যানজটের কারণে এভাবেই উন্নত বিশ্বের সমৃদ্ধ অর্থনীতির তুলনায় পিছিয়ে পড়ছে আমাদের গোটা অর্থনীতি। সাম্প্রতিক গবেষণা থেকে জানা যায়, রাজধানী ঢাকায় যানজটের কারণে বছরে ক্ষতির পরিমাণ হাজার হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে জ্বালানি ব্যয়, রাস্তায় দুর্ঘটনাজনিত ব্যয়, পরিবহনের ব্যয়সহ অন্যান্য ব্যয় রয়েছে। এ ক্ষতি বিশ্বের যে কোনো দেশের তুলনায় অনেক বেশি। একটা বিষয় সুস্পষ্ট যে যানজট অবশ্যই সামগ্রিকভাবে পরিবহন খরচ বাড়ায়। অন্যদিকে কোনো কোনো শিল্পোদ্যোক্তা যানজটের কবল থেকে রক্ষা পেতে কার্যধারায় পরিবর্তন এনেছেন, এমনকি সময়সূচি এবং কলকারখানার স্থান পরিবর্তন করছেন। যানজট নানাভাবে পণ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে বিপত্তি ঘটায়। নির্ধারিত সময়ে উৎপাদিত পণ্যসামগ্রী গন্তব্যে না পৌঁছার কারণে ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়। বিশেষ করে বিদেশে পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে এক ধরনের অস্বস্তি সৃষ্টি করে রেখেছে যানজট। অন্যান্য ব্যবসা-বাণিজ্যেও মারাত্মক প্রভাব ফেলছে অসহনীয় এই যানজট। যেমন, ফ্রেইট ডেলিভারি, ব্যবসার সময়সূচি বদলানো, ব্যবসার কার্যধারায় পরিবর্তন, কর্মীদের যাতায়াত এবং ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা, ব্যবসা স্থানান্তর, নানা ধরনের যোগাযোগমাধ্যম প্রতিষ্ঠা প্রভৃতি। হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ঢাকাণ্ডচট্টগ্রাম শহরে যানজট থেকে মুক্তির জন্য উড়াল সড়ক নির্মিত হয়েছে, এখনও নির্মাণ কাজ চলছে, আরও বেশ কিছু উড়াল সড়কের। কিন্তু শুধু উড়াল সড়ক নির্মাণ করে নগরকে যানজটমুক্ত করা সম্ভব নয়, এটা নানাভাবে প্রমাণিত হয়েছে এর মধ্যেই।
নগর পরিকল্পনাবিদরা বারবার বলছেন, শুধু ফ্লাইওভার বা উড়াল সড়ক অথবা সাবওয়ে করে যানজটের সমাধান হওয়ার নয়। ঢাকায় গণপরিবহন ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। ব্যক্তিগত পরিবহনই সর্বেসর্বা। বাসের চেয়ে এখন সাধারণ প্রাইভেটকারই রাস্তাজুড়ে দখল করে থাকে সব সময়। বেশিরভাগ প্রাইভেটকারে অনেক সময় চালক ছাড়া আর কোনো যাত্রী থাকে না। একজন যাত্রী নিয়ে প্রাইভেট কার রাস্তার অনেকটা অংশ দখল করে থাকে। ঢাকার সিটি মেয়র নাগরিক পরিবহনে সুবিধার্থে রাস্তায় অধিক পরিমাণে পাবলিক বাস নামানোর পরিকল্পনার কথা বলেছেন। এটা বাস্তবায়িত হলে গণপরিবহন ব্যবস্থায় উন্নয়ন ঘটবে সন্দেহ নেই, বাসের পাশাপাশি মেট্রোরেল লাগবে, ঢাকার চারপাশে স্যাটেলাইট সিটি করে সহজ ট্রেন যোগাযোগ বাড়াতে হবে। বর্তমানে যানজটের দুঃসহ যন্ত্রণা থেকে রক্ষা পেতে অনেকে উত্তরা, টঙ্গী, নারায়ণগঞ্জ থেকে ট্রেনে করে ঢাকায় আসা-যাওয়া করছেন প্রতিদিন কর্মক্ষেত্রে। ঢাকার যানজট কমাতে সর্বোপরি ঢাকার জনসংখ্যা কমাতেই হবে। এর জন্য বিকেন্দ্রীকরণ, অর্থাৎ সারা দেশে সুষমভাবে সরকারি প্রতিষ্ঠান ও কলকারখানা ছড়িয়ে দিতে হবে। ঢাকা সড়ক ও ভূমি ব্যবস্থাপনায় নৈরাজ্য ও দুর্নীতি কমাতে হবে। প্রাইভেট কার এবং ব্যক্তিগত পরিবহন ব্যবহারে কড়াকড়ি আইন প্রয়োগ করতে হবে। একটি পরিবারের একাধিক গাড়ি রাখার বিলাসীপ্রবণতা ছাড়তে হবে। রাজধানীকে রাজধানীর মতো দেখাতে হবে- এটাই হলো আসল কথা। সবাইকে এটা গভীরভাবে উপলব্ধি করতে হবে, যানজট শুধু জিডিপির অংশই খাচ্ছে না, আমাদের সবার জীবনটাকে নিরানন্দময়, ক্লান্তিকর, বিরক্তিকর করে তুলছে। এ অবস্থা আর বেশি দিন চলতে দেওয়া যায় না। এর অবসান জরুরি ভিত্তিতে হওয়া উচিত। উন্নততর পরিবহন প্রযুক্তির বিকাশ ও প্রয়োগ নিশ্চিত করার মাধ্যমে এবং একটি জাতীয় অভ্যন্তরীণ ট্রাফিক সিস্টেম প্রণয়ন করে যানজট সমস্যা দূর করা সম্ভব। অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথে বিদ্যমান সব বাধা অতিক্রম করতে বর্তমান সরকার বদ্ধপরিকর। যানজট দূরীকরণে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে ব্যর্থ হলে আগামীতে অর্থনীতিতে সংকট আরও ঘনীভূত হতে পারে। (সূত্র: আলোকিত বাংলাদেশ)।
- লেখক: অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার ও কলাম লেখক