- Advertisement -
হোম মতামত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের এপিটাফ

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের এপিটাফ

- Advertisement -

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের এক মাস্টার্স পড়–য়া শিক্ষার্থী ইদানীং হঠাৎ করেই মধ্যরাতে চিৎকার দিয়ে তার বিভাগের শিক্ষকদের অশ্লীষ ভাষায় গালাগাল দিতে থাকে। তার উচ্চ আওয়াজে বাড়ির সবার ঘুম ভেঙে যায়। বাবা-মা লজ্জিত হয়ে জোরে জোরে ছেলেকে ডাকে আর বলে কি বকছিস ছিঃ ছিঃ মাস্টারদের কি কেই এভাবে বকাঝকা করে? চেঁচামেচিতে ছেলের ঘুমের ঘোর কাটলে সব ঘটনা শুনে লজ্জিত হয়। স্বপ্নে আমি এটা কী করলাম? পিতৃতূল্য গুরুজনকে বকাঝকা করেছি! সে বলে উঠে সরি বাবা। আসলে আমি স্বপ্নে কী যে দেখি ইদানীং…। এরূপ একবার দু’বার নয়, বেশ কয়েকদিনই হচ্ছে। বাবা-মা চিন্তায় পড়ে। ছেলেও ইদানীং মনমরা থাকে। বাবার চিন্তা বেড়ে যায়। ছেলেকে বলে, চলত ডাক্তারের কাছে যাই। ছেলে পিতা-মাতার বাধ্য সন্তান। বাবার কথামতো ডাক্তারের কাছে যায়। ডাক্তার ছেলের এসব স্বপ্নের কারণ জানতে চাইলে সোজা উত্তর, আমি তো এসব স্বপ্নে দেখি। আমি কিছুই জানি না। ডাক্তার বুঝতে পারে ‘সামথিং রং’। পেশেন্ট তথা ছেলের মধ্যে স্বপ্ন দেখার সময় কনসাস ইনহিবিশন, তথা বিচারবুদ্ধি লোপ পায় এবং ইননার ইনস্টিন্ট তথা ভেতরের আদিম ইচ্ছা জাগ্রত হয়। বাবা-মাকে ছেলের এ অবস্থার কথা বললে তাদের এত ভালো ছেলে এমন হওয়ার প্রশ্নই আসে না বলে রীতিমতো চ্যালেঞ্জ করে। ডাক্তার তখন পিতা-মাতাকে চেম্বারের বাইরে রেখে পেশেন্টকে কনসাস ইনহিবিশন লোপ পাওয়ার ড্রাগ পুশ করেন। ডোজের কার্যকারিতা শুরু হলেই বলতে শুরু করে শিক্ষক নামের কুলাঙ্গার! এদের জন্যই পরীক্ষাটা দেওয়া হলো না। আর মাত্র একটি পরীক্ষা। বাড়ি থেকে কত টাকা নেব? কবে লেখাপড়া শেষ হবে চাকরি করব! আর বিবাহ… সে তো হেনস্ত দূর। জীবনটাই শিক্ষক শেষ করে দিল রে… কী করব, ইত্যাদি ইত্যাদি। ছেলে যত ভালোই হোক না কেন, করোনাকালীন বাড়িতে বসে থেকে ট্রমাইজড হয়ে যাওয়ায় এখন সে এভাবে বকছে। এটা তার হৃদয়ে লালিত কথা। কনসাস ইনহিবিশনের কারণে মানুষ সামাজিক ও সভ্য আচরণ করে। মনের ভেতর অনেক সত্য লুকায়িত থাকলেও বাস্তবতার কারণে তা বলতে পারে না। যেমনটি শিক্ষার্থী ড্রাগ খাওয়ার আগে বলতে পারেনি। ড্রাগ খাওয়ার পরে; কিন্তু সে ঠিকই বলেছে। এটাই তার ভেতরের সত্য।

আমার ধারণা, এ গল্পটি একজন ছাত্র নিয়ে বলা হলেও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শিক্ষার্থীর মনের কথা এটি। স্যাররা তাদের সবচেয়ে আপন, এজন্য ক্ষোভ বা রাগ, অভিমান আরও অনেক বেশি। গত প্রায় দেড় বছর যাবত দিকনির্দেশনাহীনভাবে একজন শিক্ষার্থী আর কত ঘরে বসে থাকতে পারে? মানসিক রোগের কোনো পরিসংখ্যান না পেলেও একথা ধরে নেওয়া যায় অনেকেই এখন এ রোগে আক্রান্ত। দেশের নিম্নমধ্যবিত্ত বা মধ্যবিত্তের সন্তানদের শতকরা ২৫ শতাংশ শিক্ষায় আর ফিরে আসতে পারবে না। আমার এক শিক্ষার্থী টেলিফোন করে বলেছে, স্যার যেভাবেই হোক আমাদের শিক্ষাজীবনের ইতি টেনে দিন। অফলাইন বা অনলাইন পরীক্ষা নিন অথবা অটোপাসের সার্টিফিকেট দিন। আমাদের আসলে স্যার বাঁচতে দিন। আর পারছি না।

লকডাউন শুরু হওয়ার দিনগুলোতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অতিদ্রুতই অনলাইন পদ্ধতিতে ক্লাস সমাপ্ত করে অনলাইনেই পরীক্ষা নেওয়া শুরু করে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিকদের দাবির মুখে সরকার এ সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। এ সিদ্ধান্তের আলোকে এসব মালিকানাদীন বিশ্ববিদ্যালয় প্রাথমিক ধাক্কা কাটিয়ে উঠে বেশ ভালোই করছে। তারা অনলাইনে ক্লাস, পরীক্ষা অ্যাসেসম্যান্ট, ভাইবা সব কিছুই নিচ্ছে। আমার এক সিনিয়র শিক্ষক অবসরে গিয়ে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত। যে কম্পিউটার চালাতে জানত না, বেসরকারি ভার্সিটিতে চাকরির সুবাদে ৬৮ বছর বয়সে তিনি প্রায় সব ডিভাইস চালানোতে দক্ষ হয়ে উঠেছেন। তার ভাষায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা অনেক পিছিয়ে যাচ্ছে। চাকরির বাজার এখন অনেকটাই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েটদের দখলে। এমনকি ২০২০ সালের ১৭ মার্চ দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণার পরও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষা চলমান ছিল। ওই সময় স্থগিত হওয়া অনার্স-চতুর্থবর্ষ ফাইনাল পরীক্ষা, যার ৩০টি বিষয়ের তদ্বীয় পরীক্ষা সম্পন্ন হওয়ার আগে সরকারি নির্দেশ অনুযায়ী বাকি পরীক্ষাগুলো স্থগিত ঘোষণা করা হয়, এ পরীক্ষায় পরীক্ষার্থী সংখ্যা ছিল ২ লাখ ২৬ হাজার। এছাড়া ২০১৯ সালের তৃতীয় বর্ষের লিখিত পরীক্ষা শেষ হলেও ব্যবহারিক ও মৌখিক পরীক্ষা স্থগিত হয়ে যায়। এসব পরীক্ষা সম্প্রতি নেওয়া হয়েছে এবং বেশ কয়েকটি পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হয়েছে।

বিপত্তি ঘটেছে শুধু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে। কাগজে-কলমে স্বায়ত্তশাসিত লেখা থাকলেও সব সিদ্ধান্তের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়। কোভিড-১৯ মোকাবিলায় সরকারের সব সিদ্ধান্ত আমাদের যেরূপ মানতে হবে, আবার দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় যাতে শিক্ষা ও গবেষণায় শূন্যতা দেখা না দেয়, সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে। কিন্তু মার্চের পর সব বিশ্ববিদ্যালয় প্রায় পাঁচ মাস কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই বন্ধ থাকল। তারপর ইউজিসির টনক কিছুটা হলেও নড়ল। অনলাইনে শিক্ষা নিয়ে তারা ভাবনা শুরু করল এবং ধীরে ধীরে বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস নিতে বলল। ভালো কথা। এরই মধ্যে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অনেকদূর এগিয়েছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকবৃন্দ ক্লাস নিলেন; কিন্তু পরীক্ষার অনুমতি পেল না। ডিসেম্বরে এসে অনুমতির সুযোগে প্রত্যেক বিভাগই দু-একটি ব্যাচ বের করে দিতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের কারণে সব বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ রাখতে বলেছে। দেশকে নিরাপদ রাখার জন্য এ পদক্ষেপ নিঃন্দেহে প্রশংসনীয়, তবে জাতীয় মেরুদ- শিক্ষাব্যবস্থা কিভাবে ধুকে ধুকে মরছে, সে অবস্থাটাও সরকার বাহাদূরকে চিন্তা করতে হবে। হঠাৎ করে বন্ধ করে দেওয়ায় আবার কবে বিশ্ববিদ্যালয় খুলবে এ নিয়ে সংশয় রয়েছে। সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী ১৭ মে হলগুলো খুলে দেওয়ার কথা রয়েছে। কোভিডের ব্যাপকতায় খুলতে না পারলে আপত্তি নেই, তবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে কোভিডের সব নিরাপদ নির্দেশনা মেনে পরীক্ষা নেওয়ার সুযোগ দেওয়া যেতে পারে অথবা অনলাইনে পরীক্ষা নেওয়ার জন্য সফটওয়্যার সরবরাহ করতে পারে কিংবা সব বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সাইন্স/ইনফরমেশন সাইন্স বিভাগ সক্রিয়। তাদের দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় নিজেদের মতো পরীক্ষা পদ্ধতি প্রতিষ্ঠা করতে পারে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়কে আরও একটিভ করার জন্য শিক্ষা ও গবেষণা প্রণোদনা দেওয়া যেতে পারে।

কিন্তু হায়! কখন কীভাবে সিদ্ধান্ত হয় আমরা কেউ জানি না। জানার দরকার নেই। কাজ হলেই হলো। কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে ইউজিসি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে অনলাইনে পরীক্ষা নেওয়ার ব্যাপারে আস্থা রাখলেও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাপারে এতটুকু আস্থাও নেই। শুনেছি স্বউদ্যোগে তারা আবার সক্রিয় হওয়ার চিন্তা-ভাবনা করছেন। একটি পত্রিকার খবর অনুযায়ী অনলাইনে পরীক্ষা নিতে গত ২৪ মার্চ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিবের সভাপতিত্বে একটি সভা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পরীক্ষা অনলাইনে গ্রহণের বিষয়ে সুপারিশ প্রদানের জন্য আরেকটি কমিটির সভাপতি করা হয়েছে ইউজিসির একজন সম্মানিত সদস্যকে। নতুন এ কমিটি দেশে-বিদেশে অনলাইন পরীক্ষা গ্রহণের বর্তমান প্র্যাকটিসগুলো পর্যালোচনা করে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি রোড ম্যাপ প্রণয়ন করে মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন দাখিল করবে। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে বিভিন্ন পরীক্ষা অনলাইনে গ্রহণের বিষয়ে সুপারিশ প্রদানের জন্য আরেকটি কমিটি করা হয়েছে। এ কমিটির সভাপতি করা হয়েছে ইউজিসির সম্মানিত সদস্যকে। দুই কমিটির সভাপতি একজন। কমিটি অনলাইন পরীক্ষায় কম্পিউটার, ব্যান্ডউইথ, সংযোগ, সফটওয়্যার, পরিবেশ, প্রযুক্তিগত সমস্যা দেখা দিয়েছে উভয় কমিটির কার্যপরিধিতে বলা হয়েছে, কমিটি দেশে-বিদেশে অনলাইন পরীক্ষা গ্রহণের বর্তমান প্র্যাকটিসগুলো পর্যালোচনা করে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি রোড ম্যাপ প্রণয়ন করে সরকারের কাছে দেবে। কমিটির সভাপতি পত্রিকাকে বলেছেন, আমাদের প্রতিবেশী দেশÑ ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কীভাবে অনলাইনে পরীক্ষা নিচ্ছে তার খোঁজখবর নিয়ে সামারি তৈরির কাজ করছি। তিনি আরও বলেন, আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে শিক্ষার্থীদের অনলাইনে পরীক্ষা নেওয়া কঠিন। ইন্টারনেটের গতি অনেক স্লো। এটা (করোনা মহামারি) কত বছর চলবে, কেউ বলতে পারছেন না। শিক্ষাব্যবস্থা তো ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। এ থেকে উত্তরণে অনলাইনে পরীক্ষা নেওয়ার চিন্তা-ভাবনা চলছে। যাক ইউজিসি এক বছরের মাথায় চিন্তা করছে, তাও তো আনন্দের সংবাদ। খবর নিতে এবছরের বাকি সময় চলে গেলেও আমাদের আশ্চার্যান্বিত হওয়ার কিছু থাকবে না। ইউজিসির সদস্য যেসব দেশের কথা উল্লেখ করেছেন এর প্রত্যেকটি দেশে কোভিড-১৯ নিয়ম মেনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চলমান। কারণ তারা জানে কোনো অবস্থাতেই শিক্ষার মেরুদ- ভাঙা যাবে না। আর আমরা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো কাজ বা পরীক্ষার অনুমতি না দিয়ে শুধুই ক্লাস নিচ্ছি। পরীক্ষার কোনো ঘোষণা না থাকায়, এসব অনলাইন ক্লাসে শিক্ষার্থীরাও আগ্রহ হারিয়েছে। করোনা মহামারি প্রতিরোধের নিয়মনীতি মেনে যদি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম আবার শুরু করা না হয়, এপিটাফের করালগ্রাস পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সব পর্যায়ের সংশ্লিষ্টদের গ্রাস করবে, সন্দেহ নেই।

ড. মুহাম্মদ ইকবাল হোছাইন
অধ্যাপক, ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়

- Advertisement -
- Advertisement -
- Advertisement -

আরও সংবাদ

- Advertisement -