- Advertisement -
হোম ধর্ম আদর্শ মানুষ গঠনে রোজার শিক্ষা

আদর্শ মানুষ গঠনে রোজার শিক্ষা

- Advertisement -

মাসূদ বিন তাজিম: হিজরি সনের নবম মাস রমজান। এটিকে বলা হয় প্রশিক্ষণের মাস। এ মাসের মূল উদ্দেশ্য হলো, সিয়াম সাধনার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন করা। এ ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে মোমিনরা! তোমাদের জন্য রোজা ফরজ করা হলো, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্বে যারা ছিল তাদের প্রতিও; যাতে করে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার।’ (সুরা বাকারা : ১৮৩)।

তাকওয়ার শাব্দিক অর্থ হলো ভয় করা, বিরত থাকা বা বেঁচে থাকা। আর ব্যাপক অর্থে তাকওয়া হলো, মহান আল্লাহকে জীবনের সর্বাবস্থায় হাজির-নাজির জেনে তার আদেশকৃত বিষয়গুলো মান্য করা এবং নিষেধকৃত বিষয়গুলো থেকে বিরত থাকা। অর্থাৎ নামাজ, রোজা, হজ, জাকাতসহ অন্য ইবাদতগুলো সঠিক নিয়মে একাগ্রচিত্তে নিয়মিত আদায়করত আল্লাহর ভয়ে জীবনের প্রতিক্ষেত্রে মিথ্যা বলা, গিবত করা, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, প্রতারণা, ঘুষ, দুর্নীতি, জুুলুম, ওজনে কম দেওয়া, খাদ্যে ভেজাল দেওয়া, ধর্ষণ, খুন, সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ ইত্যাদি থেকে বিরত থাকার নামই প্রকৃত তাকওয়া।

আর রোজাই একজন প্রকৃত রোজাদারকে এই তাকওয়া অর্জনের প্রকৃত প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে। কারণ রোজায় একদিকে যেমন মহান আল্লাহর পূর্ণ আনুগত্যের প্রকাশ ঘটে অন্যদিকে যাবতীয় মিথ্যাচার, অশ্লীলতা ও পাপাচার থেকে বিরত থাকার অনুশীলনও হয়। একজন রোজাদার শুধু মহান আল্লাহর হুকুম পালনের জন্যই সুবহে সাদিকের আগে সাহরি খেয়ে রোজা শুরু করে। এরপর শুধু মহান আল্লাহর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে বলেই সারাদিন তথা ইফতার পর্যন্ত নির্দিষ্ট কিছু কাজ বিশেষ করে পানাহার ও যৌনাচার থেকে বিরত থাকে। যে কাজগুলো অন্য সময়ে বা মাসে এমনকি রমজান মাসের রাতেও হালাল। এভাবে রোজার মাধ্যমে মানুষ সর্বাবস্থায় আল্লাহর হুকুম পালনের উত্তম প্রশিক্ষণ পেয়ে থাকে।

রমজান মাস ইবাদতের মাস। এ মাসে ইবাদতের ফজিলতও অন্য মাসের তুলনায় অনেক বেশি। হাদিসে রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘রমজান মাসে যে ব্যক্তি একটি নফল আদায় করল, সে যেন অন্য মাসের একটি ফরজ আদায় করল। আর যে এ মাসে একটি ফরজ আদায় করল, সে যেন অন্য মাসের সত্তরটি ফরজ আদায় করল।’ (বায়হাকি)। অন্য হাদিসে এসেছে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মানব সন্তানের প্রতিটি নেক আমলের প্রতিদান ১০ থেকে ৭০০ গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন, কিন্তু রোজার বিষয়টি ভিন্ন। কেননা, রোজা শুধু আমার জন্য, আমিই তার প্রতিদান দেব।’ (মুসলিম)। আরেক হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেছেন, ‘অবশ্যই আল্লাহ তায়ালা রমজান মাসের প্রত্যেক দিন ও রাতে অসংখ্য ব্যক্তিকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দান করেন এবং প্রত্যেক মোমিন বান্দার একটি করে দোয়া কবুল করেন।’ (মুসনাদে আহমাদ)।

তাই নিয়মিত ইবাদতকারীরা বেশ উৎসাহ-উদ্দীপনার সঙ্গে ফরজ রোজা, ফরজ নামাজ ও অন্যান্য ফরজ আদায়সহ তারাবির নামাজ, বেশি বেশি নফল নামাজ, পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত, জিকির, ইতেকাফ ও অন্যান্য নফল ইবাদত আদায় করে থাকে; যা তাদের ঈমান ও ইবাদতের ওপর অবিচল থাকতে সাহায্য করে। তাদের তাকওয়া আরও বহুগুণে বেড়ে যায়। এছাড়া যারা অন্যান্য মাসে ঠিকমতো নামাজ ও অন্যান্য ইবাদত করে না তারাও এ মাসে রোজাসহ ফরজ নামাজ, তারাবির নামাজ, শবেকদরে ইবাদত ও অন্যান্য নফল ইবাদত করে থাকে, যা অনেককে আল্লাহর ইবাদতে একনিষ্ঠ ও নিয়মিত হতে সাহায্য করে। এমনকি যারা এ মাসে রোজা রাখতে পারে না বা রাখে না, তারাও দিনের বেলায় প্রকাশ্যে খাবার গ্রহণসহ নানা বিষয়ে সংযত হয়ে সংবেদনশীল আচরণ করে থাকে।

রোজার বদৌলতে এ মাসে হারাম কাজগুলোর চর্চাও অনেকাংশে হ্রাস পায়। যেহেতু নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি মিথ্যা-প্রতারণা ও গোনাহের কাজ ত্যাগ করে না, আল্লাহ তায়ালার কাছে তার পানাহার থেকে বিরত থাকার কোনো মূল্য নেই।’ (বোখারি, আবু দাউদ)। অন্য হাদিসে নবীজি (সা.) বলেন, ‘কত রোজাদার এমন আছে, (রোজা অবস্থায় অশ্লীল কথা ও কর্ম থেকে বিরত না থাকার ফলে) ক্ষুধা ও পিপাসা ছাড়া রোজা থেকে সে আর কিছু লাভ করতে পারে না। তদ্রপ অনেক রাত জাগরণকারী এমন আছে যে, তার রাতজাগরণ থেকে জেগে থাকার কষ্ট ছাড়া আর কিছু পায় না।’ (ইবনে মাজাহ)। তাই রোজাদার রোজা নষ্ট হওয়ার ভয়ে মিথ্যাজনিত বিষয়াদি থেকে নিজে বিরত থাকে এবং অন্যকেও মিথ্যা বলা বা মিথ্যার সংশ্লিষ্টতা থেকে বিরত থাকতে উৎসাহিত করে। একইভাবে রোজাদার পরনিন্দা ও গিবত করা থেকে বেঁচে থাকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করে।

রোজার কারণে মানুষ নিজে ঝগড়া করে না এবং অন্যকেও ঝগড়া-ফ্যাসাদ থেকে নিবৃত করে। অনেক নেশাগ্রস্ত লোক এ মাসে ধূমপান বা অন্যান্য নেশা ছেড়ে দেয়। এ মাসে রোজার মাধ্যমে মানুষের প্রতি মানুষের সহানুভূতি ও ভালোবাসা বাড়ে। এছাড়া এ মাসে মানুষ বেশি বেশি দান-সদকা করে। অনেকে এ মাসেই জাকাত আদায় করে। এ মাসে কর্মের প্রতি জবাবদিহিতা ও দায়িত্ববোধ বেড়ে যায়। এগুলোই রোজার প্রকৃত শিক্ষা এবং এভাবেই রোজা মানুষকে প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে। আর এগুলোর প্রতিটিই আদর্শ মানুষ হয়ে ওঠার অনুশীলন মাত্র।

রোজার মাধ্যমে মুসলমান আত্মশুদ্ধি অর্জন করে। মানুষ হয়ে যায় আল্লাহভীরু বা তাকওয়াবান। আর সত্যিকার অর্থে যদি কোনো মানুষ আল্লাহভীরু বা তাকওয়াবান হয়, তবে আল্লাহর ইচ্ছায় সেই মানুষ শুধু রোজার ১ মাস কেন বছরের বাকি ১১ মাস এমনকি জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে সত্য-মিথ্যা ও হালাল-হারামের পার্থক্য নির্ণয় করে জীবন অতিবাহিত করতে পারে। শয়তানের কুমন্ত্রণা ও বন্ধু-বান্ধব বা পরিবার-পরিজনের প্রলোভন বা ভ্রান্তি থেকেও নিজেকে রক্ষা করত এবং যাবতীয় অন্যায়, দুর্নীতি বা পাপাচার থেকে দূরে থাকতে সক্ষম হয়। আর এর নিশ্চয়তা মহান আল্লাহ স্বয়ং নিজেই দিয়েছেন। আল্লাহপাক বলেন, ‘হে মোমিনরা! যদি তোমরা তাকওয়া অর্জন করো তবে আল্লাহ তোমাদের সত্য-মিথ্যার পার্থক্য করার শক্তি দেবেন, তোমাদের পাপ মোচন করবেন এবং তোমাদের ক্ষমা করবেন। আর আল্লাহ তায়ালা অতিশয় মঙ্গলময়।’ (সুরা আনফাল : ২৯)।

অন্য আয়াতে আল্লাহপাক বলেন, ‘নিশ্চয়ই যারা তাকওয়া অর্জনকারী হয় তাদের যখন শয়তান কুমন্ত্রণা দেয় তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে এবং তৎক্ষণাৎ তাদের দৃষ্টি খুলে যায়। তাদের সঙ্গী-সাথিরা তাদের ভ্রান্তির দিকে টেনে নেয়, তারপরও তারা এ বিষয়ে কোনো ত্রুটি করে না।’ (সুরা-আরাফ : ২০১- ২০২)। সর্বোপরি তাকওয়া অর্জনকারী মানুষ হয়ে যায় সেরা ও আদর্শ মানুষ। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে সে ব্যক্তিই আল্লাহর কাছে অধিক মর্যাদাবান; যে অধিক মুত্তাকি বা আল্লাহভীরু।’ (সুরা হুজরাত : আয়াত ১৩)।

হাদিসেও তাকওয়াবান ব্যক্তিকে সম্মানিত ঘোষণা করা হয়েছে। যেমন একবার রাসুল (সা.) কে প্রশ্ন করা হলো, ইয়া রাসুলুল্লাহ মানুষের মধ্যে অধিক সম্মানিত কে? তিনি বললেন, তাদের মধ্যে যে অধিক মুত্তাকি বা পরহেজগার। (বোখারি ও মুসলিম)। অতঃপর এমন ব্যক্তির জন্য পুরস্কার হিসেবে রয়েছে জান্নাত। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আর যে ব্যক্তি তার রবের সামনে উপস্থিত হওয়ার ভয় রাখে এবং নিজেকে কুপ্রবৃত্তি থেকে ফিরিয়ে রাখে, নিশ্চয় জান্নাত হবে তার আবাসস্থল।’ (সূরা নাজিয়াত : ৪০-৪১)।

পরিশেষে বলতে হয়, রমজান মাসে সিয়াম সাধনার পাশাপাশি যাবতীয় হারাম কাজ বর্জন করে রোজার প্রকৃত শিক্ষা ‘তাকওয়া’ অর্জন করে সে তাকওয়া বাকি ১১ মাস তথা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা রোজাদারের আবশ্যিক দায়িত্ব। আর তা করতে পারলে প্রত্যেক রোজাদারই হবে একএকজন আদর্শ মানুষ এবং সমাজ ভরে যাবে আর্দশ মানুষের পদচারণায়। (সূত্র: আলোকিত বাংলাদেশ)।

লেখক : প্রবন্ধকার

- Advertisement -
- Advertisement -
- Advertisement -

আরও সংবাদ

- Advertisement -