- Advertisement -
হোম মতামত করোনার টিকা নিন, অপপ্রচার বন্ধ করুন

করোনার টিকা নিন, অপপ্রচার বন্ধ করুন

- Advertisement -

ডা. মোহাম্মদ হাসান জাফরী: বিশ্বব্যাপী করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থার অনুমোদন পেয়ে যেসব টিকা দেশে এসেছে, তা গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি, কারণ এ টিকা আমাদের দেহে করোনার বিরুদ্ধে প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে তোলে। রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা যত মজবুত হবে, রোগের আশংকা ততই কমে যাবে। তাই গুজবে কান না দিয়ে, বসে বসে দুশ্চিন্তা না করে টিকা নিন, রোগ প্রতিরোধে অংশ নিন। একটি পরিবারে একজন আক্রান্ত হলে অন্যদেরও আক্রান্ত হওয়ার আশংকা থাকে, এজন্য সবাই মিলে টিকা নিয়ে এ ভাইরাসজনিত রোগের আক্রমণের গতিকে সমন্বিতভাবে প্রতিরোধ করতে হবে।

বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থার অনুমোদিত করোনার টিকা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের জরুরি উদ্যোগে দেশে এসে পৌঁছেছে। পৃথিবীব্যাপী করোনার টিকা নেয়া শুরু হয়েছে, কারণ রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা জোরদার করতে টিকা নেয়ার কোনো বিকল্প নেই। গবেষণা চলছে, গবেষণা চলবে, দিনে দিনে আরো উন্নত ধরনের টিকা বিজ্ঞানীরা তৈরি করবেন। এটাই স্বাভাবিক এবং চলমান এক প্রক্রিয়া। এক সময় কলেরা, বসন্তসহ নানাবিধ রোগের টিকার মতোই আরো উন্নত টিকা পৃথিবী থেকে এ রোগ নির্মূলে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। তাই ভাইরাস আক্রমণ ঠেকাতে সব শ্রেণির মানুষকে এ যাত্রায় অংশ নিতে হবে। সমগ্র বিশ্বকে আলোড়িত করে এ পর্যন্ত ১০ কোটির বেশি মানুষ করোনায় আক্রান্ত হয়েছে এবং প্রায় ২২ লক্ষাধিক মানুষের মৃত্যুও ঘটিয়েছে এই করোনা ভাইরাস। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে চীনের হুবেই প্রদেশের রাজধানী উহান থেকে প্রথম ছড়িয়ে পড়ে করোনাভাইরাস। রোগের উৎপত্তি স্থল নিয়ে মতভেদ থাকলেও এ নিয়ে সময় নষ্ট করার সুযোগ নেই। যেহেতু বর্তমানে রোগটি পৃথিবীব্যপী বিস্তার লাভ করেছে, তাই এর মোকাবিলা আমাদের একসাথেই করতে হবে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) গত ১১ মার্চ বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারি ঘোষণা করে। বর্তমানে বিভিন্ন দেশে করোনার দ্বিতীয় ও তৃতীয় ঢেউ লেগেছে। যুক্তরাজ্যসহ বেশ কয়েকটি দেশে করোনার নতুন ধরন দেখা দিয়েছে। করোনায় সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত ও মৃত্যু হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে। মানুষ চেষ্টা করেছে স্বাস্থ্যবিধি যথাসম্ভব মেনে চলার, কিন্তু জীবনধারণের নানা ক্ষেত্রে অনেক সময়েই সকল স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাও কষ্টসাধ্য এবং তা সম্ভবও হয়নি। তাই এ রোগ নিরাময় এবং নির্মূল স্বাস্থ্যবিধির সাথে সাথে টিকা গ্রহণও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

সত্যিকারের জীবাণু শরীরে প্রবেশ করলে যেমন অ্যান্টিবডি তৈরি হয়, টিকার ক্ষেত্রেও সেই একই ভাবে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়। আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা এমনভাবে তৈরি যে, এই টিকার দ্বারা যে ইমিউনিটি তৈরি হয়, তার একটা স্মৃতি শরীরে থেকে যায়। ফলে ভবিষ্যতে যখন সত্যি সত্যি সেই জীবাণু দিয়ে সংক্রমণ ঘটে তখন দেহের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা খুব দ্রুত অ্যান্টিবডি তৈরি করে জীবাণুগুলিকে ধ্বংস করে ফেলে ও শরীর সুস্থ থাকে। এ ভাবেই টিকার মাধ্যমে দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। করোনার টিকাও এর ব্যতিক্রম কিছু নয়। বাংলাদেশ সরকারের একটি অন্যতম সফল প্রোগ্রাম হলো সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই)। টিকাদানের মাধ্যমে আমাদের দেশ থেকে হাম, পোলিও, ধনুষ্টংকার, যক্ষ্মাসহ অনেক রোগ প্রায় নির্মূল হয়ে যাচ্ছে। অথচ এক সময় এসব রোগে অনেক শিশু মৃত্যুবরণ করতো। টিকাদানের প্রভাব যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ এবং সফল, তা এ ঘটনার মাধ্যমে সহজেই প্রতীয়মান হয়। টিকাদানে সফলতার জন্য আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা ২০১৯ সালে “ভ্যাক্সিন হিরো” এওয়ার্ডে ভূষিত হয়েছেন। আশা করা যায়, আমাদের যোগ্য প্রধানমন্ত্রী নেতৃত্বে অদূর ভবিষ্যতে ইপিআই এর মতো করোনা টিকা দিয়ে আমাদের দেশ থেকে করোনা নির্মূল করতেও আমরা সক্ষম হবো।

করোনাভাইরাস মোকাবিলায় বাংলাদেশে টিকাদান কর্মসূচি শুরু হলেও টিকা নেওয়ার ক্ষেত্রে এখনো কিছু মানুষের মধ্যে অনীহা দেখা যাচ্ছে। তারা মনে করছে, যে দেশ থেকে টিকা আনা হচ্ছে সেখানেই টিকা নিয়ে অনেকের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হয়েছে। কিন্তু তাদের যে টিকা নিয়ে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হয়েছে, তা বাংলাদেশে আনা টিকার চেয়ে আলাদা। আমাদের সরকার যে টিকা এনেছে, তা ভারতের সেরাম ইন্সটিটিউটে তৈরি হলেও এ টিকার মূল ফর্মুলা ও উপাদান অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের। তাছাড়া গত ২৭ জানুয়ারি টিকা গ্রহণের পর থেকে সবাই সুস্থ আছেন, স্বাভাবিক জীবনযাপন করছেন। গণভবন থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভার্চ্যুয়ালি এ টিকাদান কর্মসূচির উদ্বোধন করেছেন। টিকাদান উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেন, “কোভিশিল্ড নামের যে টিকাটি বাংলাদেশে দেয়া হচ্ছে, অন্য সব ভ্যাকসিনের তুলনায়” এ পর্যন্ত এটিই সবচেয়ে নিরাপদ ভ্যাকসিন। ছোটখাট পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আমাদের নিত্যব্যবহার্য যে কোনো ওষুধ থেকেই হতে পারে। কিন্তু তাই বলে নিজের বৃহত্তর উপকারের কথা আমাদের ভুলে গেলে চলবে না। বিশ্বে এই অল্প সময়ে প্রায় ১০ কোটি মানুষ করোনার টিকা গ্রহণ করেছে। টিকা গ্রহণ করে আমাদের নিজের প্রতি, পরিবারের প্রতি এবং দেশের প্রতি দায়িত্ব পালন করতে হবে।

গত ২৭ জানুয়ারি বাংলাদেশে প্রথম করোনার টিকা নেন কুর্মিটোলা হাসপাতালের সেবিকা রুনু ভেরোনিকা কস্তা। তিনি বলেন, টিকার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে অনেকেই অনেক কথা বলছেন, তবে তার নিজের মনে হয়েছে যে এটা নিলে কোনো সমস্যা হবে না। এরপর ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে উৎসবমুখর পরিবেশে টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রথম টিকা নেন নাক-কান-গলা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. নুরুল ফাত্তাহ রুমি। এছাড়া টিকা নিয়েছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) উপাচার্য অধ্যাপক ডা. কনক কান্তি বডুয়া, ডা. অরূপ রতন চৌধুরী প্রমুখ। তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহ্মেদ পলক সরকারের মন্ত্রিসভার প্রথম সদস্য হিসেবে করোনাভাইরাসের টিকা নিয়েছেন। টিকা নিয়ে অপপ্রচার বন্ধে তিনি নিজ আগ্রহেই টিকা নিয়েছেন এবং টিকা নিয়ে অপপ্রচারে জনগণকে কান না দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। পরবর্তীতে সংস্কৃতি বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ করোনাভাইরাসের টিকা নিয়েছেন। সরকারের সচিবদের মধ্যে সর্বপ্রথম টিকা নেন তথ্য সচিব খাজা মিয়া ও তাঁর স্ত্রী সরকারের অতিরিক্ত সচিব খালেদা আক্তার, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব আবদুল মান্নান। এছাড়া টিকা নিয়েছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের লিভার বিভাগের অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান ডা. মামুন আল মাহতাব স্বপ্নীল ও তার স্ত্রী একই প্রতিষ্ঠানের চক্ষুবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ডা. নুজহাত চৌধুরী। টিকা নেয়ার পর এত দ্রুত টিকা পাবার ব্যবস্থা করে দেবার জন্য সকলেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনাকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন। তাঁরা বলেন – “একটি ভয়াবহ ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অস্ত্র এই ভ্যাক্সিন। কোনো অনর্থক ভয় অথবা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচারে বিভ্রান্ত হয়ে নিজেকে ও নিজের প্রিয়জনকে রক্ষার এই সুযোগ থেকে নিজেদের বঞ্চিত করবেন না”।

বর্তমানে সারাদেশে টিকা পাঠানোর ব্যবস্থা করেছে সরকার, যা ৭ ফেব্রুয়ারি থেকে জনগণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে। যারা সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে আছেন, তাদের অগ্রাধিকার দিয়ে ভ্যাকসিন দিতে হবে। প্রথমেই কোভিড রোগীদের চিকিৎসায় নিয়োজিত সরকারি বা বেসরকারি ডাক্তার, নার্সসহ স্বাস্থ্যকর্মীদের ভ্যাকসিন দিতে হবে। এরপর যাদের সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি যেমন : ষাটোর্ধ্ব বয়স্ক ব্যক্তি এবং যারা অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত (উচ্চরক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, কিডনি বা লিভারের রোগ, স্ট্রোক) তাদের। কারণ এসব মানুষের সংক্রমণের ঝুঁকি যেমন বেশি, তেমনি সংক্রমিত হলে জটিলতা এমনকি মৃত্যুর ঝুঁকিও অনেক বেশি। এ ছাড়াও নিরাপত্তাকর্মীরা (পুলিশ, আনসার, সেনাবাহিনী, বিজিবি), সাংবাদিক, পরিবহণকর্মী, মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষক, অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী, বিশিষ্ট ব্যক্তি এবং জনপ্রতিনিধিরা এর আওতায় রয়েছেন। “সুরক্ষা” অ্যাপ এর মাধ্যমে টিকা নেওয়ার জন্য রেজিস্ট্রেশন করা যাবে।

যাদের বয়স ১৮ বছরের নিচে, গর্ভবতী নারী, যাদের অ্যালার্জির সমস্যা আছে, বেশি বয়স্ক মুমূর্ষু রোগী এবং যাদের শারীরিক প্রতিরোধ ক্ষমতা কম (যেমন ক্যান্সারের রোগী যারা কেমোথেরাপি বা রেডিও থেরাপি নিচ্ছেন) তারা টিকা নিতে পারবেন না। তবে গর্ভবতী নারী, যারা পেশাগত বা অন্য কোনো কারণে সংক্রমণের উচ্চঝুঁকিতে রয়েছেন, তারা চাইলে টিকা নিতে পারবেন।

সরকারের লক্ষ্য আগামী ৬ মাসের মধ্যে দেশের একটা বড়ো অংশকে টিকার আওতায় এনে করোনার সংক্রমণ উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে আনা। আমাদের দায়িত্ব টিকা নিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হাতকে শক্তিশালী করা, দেশকে করোনামুক্ত করা। এ দায়িত্ব আমাদের দেশের স্বার্থে-জাতির স্বার্থে।

টিকা নিয়েই আমাদের দায়িত্ব শেষ, এমনটা নয়। টিকার ২ ডোজ পরিপূর্ণ না করা পর্যন্ত আমরা করোনা ভাইরাস থেকে ঝুঁকিমুক্ত হতে পারবো না। তাই এ সময়টাতে আমাদের সতর্কতা কমানো যাবে না। আর করোনা শূণ্যের কোঠায় না নামা অবধি আমাদের স্বাস্থ্যবিধি যেমন মাস্ক ব্যবহার, হাত ধোয়া, সমাজিক দূরত্ব বজায় রাখা মেনে চলতে হবে। শুধু করোনাকালেই নয়, স্বাস্থ্য সংক্রান্ত এ বিধি সর্বদাই যথাসম্ভব আমাদের মেনে চলা উচিৎ। কারণ এতে করে অন্যান্য অনেক রোগও প্রতিরোধ করা সম্ভব। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাদের জন্য দ্রুত সময়ে টিকার ব্যবস্থা করেছেন। আসুন আমরা টিকা নিয়ে এবং আমাদের দায়িত্ব পালন করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে একটি করোনামুক্ত দেশ উপহার দিতে এগিয়ে আসি এবং সকলে বিশ্বাস করি- ‘টিকা নিয়ে ভয় নয়, করোনা হবে নিরাময়’।#

(পিআইডি শিশু ও নারী উন্নয়নে যোগাযোগ কার্যক্রম নিবন্ধ)

- Advertisement -
- Advertisement -
- Advertisement -

আরও সংবাদ

- Advertisement -