- Advertisement -
হোম ধর্ম আর্থসামাজিক উন্নয়নে ফিতরা

আর্থসামাজিক উন্নয়নে ফিতরা

- Advertisement -

রমজানের সিয়াম সাধনার পর মহান আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে পুরস্কার হিসেবে সারা বিশ্বের মুসলিমরা ঈদ উদযাপন করে। কোরআন নাজিলের বর্ষপূর্তির এ মাসের শেষ উৎসব হয় বিশ্বব্যাপী। পৃথিবীতে একই দিনে একই সময়ে এত বড় উৎসব এভাবে পালিত হয় না। দুনিয়ার আর কোনো ধর্ম কিংবা দর্শনে এর নজির নেই।

ধনীদের সঙ্গে গরিবরা যাতে এ উৎসবে সমভাবে অংশগ্রহণ করতে পারে তার জন্য জাকাতুল ফিতর বা ফিতরা আদায় করা ওয়াজিব করা হয়েছে। ধনীদের অর্থ গরিবদের মধ্যে বণ্টন করা

হয়। তাদের মুখে হাসি ফুটে, ধনীদের মতো তারাও আনন্দে শরিক হতে পারে। ফলে সমাজে শান্তি সৌহার্দ্য ও ভালোবাসার এক অপূর্ব পরিবেশ তৈরি হয়।

ইসলামি পরিভাষায় রমজানের শেষে পবিত্র ঈদুল ফিতর উদযাপন উপলক্ষে মাথাপিছু যে নির্দিষ্ট পরিমাণ খাদ্যদ্রব্য গরিব মিসকিনদের সদকা করা হয়, তাকে সদকাতুল ফিতর বা জাকাতুল ফিতর বলে যা আমাদের সমাজে ‘ফিতরা’ হিসেবে পরিচিত।

রমজান মাসের শেষে ঈদুল ফিতরের নামাজ আদায় করার আগে প্রত্যেক মুসলিম স্বাধীন, পরাধীন (দাস-দাসী) পুরুষ-নারী, ছোট ও বড় সবার ওপর ফিতরা আদায় করা ওয়াজিব। এমনকি গর্ভস্থ সন্তানের পক্ষ হতে ফিতরা আদায় করা মুস্তাহাব। উসমান (রা.) গর্ভস্থ সন্তানের পক্ষ থেকেও তা আদায় করেছেন।

আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল (সা.) এক সা’ খেজুর অথবা এক সা’ যব, প্রত্যেক মুসলমান দাস-দাসী, স্বাধীন, পুরুষ-নারী, ছোট ও বড়, সবার ওপর জাকাতুল ফিতর ফরজ করে দিয়েছেন। আর তা ঈদের নামাজে যাওয়ার আগেই প্রদান করতে আদেশ করেছেন। (মুসলিম : ৯৮৪)।

ঈদের দু-একদিন আগে জাকাতুল ফিতর আদায় করা যায়। কেউ এরূপ করলে তার ফিতরা আদায় হয়ে যাবে। তবে বিশেষ কোনো কারণ ছাড়া এরূপ করা ঠিক নয়। কারণ রাসুল (সা.) এবং অধিকাংশ সাহাবায়ে কেরামের আমল ছিল, শেষ রোজার সূর্যাস্তের পর থেকে ঈদের নামাজের আগে আদায় করা। ঈদের দু-একদিন আগে আদায় করা যে বৈধ সে ব্যাপারে আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) এর আমল রয়েছে। নাফি ইবনে আবদুল্লাহ বলেন, ‘ইবনে ওমর (রা.) জাকাতুল ফিতর তাদের দিতেন যারা তা গ্রহণ করত। আর তারা তা ঈদের দিনের একদিন বা দু’দিন আগে প্রদান করতেন।’ (বোখারি : ১৫১১)।

যার ঘরে ঈদের দিন ও রাতে পরিবারের খরচের জন্য যা প্রয়োজন তার অতিরিক্তি ফিতরার সমপরিমাণ খাদ্যদ্রব্য যিনি দিতে সক্ষম তিনি ঈদের নামাজের আগে ফিতরা আদায় করবেন। রোজাদাররা শয়তানের কুমন্ত্রণায় মানবিক দুর্বলতার কারণে বহু ত্রুটি-বিচ্যুতি এবং গোনাহর কাজ করে ফেলে এবং তাতে রোজা অপূর্ণাঙ্গ থাকে। তাদের এ দুর্বলতা কাটানোর জন্য রোজার শারীরিক ইবাদতের পাশাপাশি কিছু আর্থিক ইবাদত তথা দান-সদকা আদায় করে রোজাকে পূর্ণাঙ্গ করার নিমিত্তে এই ফিতরা ওয়াজিব করা হয়েছে।

রাসুল (সা.) বলেন, ‘রোজা পালনকারীর অপ্রয়োজনীয় ও বেফাঁস কথাবার্তা থেকে তাকে পবিত্রকরণ এবং গরিব-মিসকিনদের খাবার প্রদানের উদ্দেশে রাসুল (সা.) ফিতরা প্রদান করাকে ফরজ করে দিয়েছেন। অতএব, যে ব্যক্তি ঈদের নামাজের আগে তা পরিশোধ করবে, সেটা ফিতরা হিসেবে আল্লাহ কাছে গৃহীত হবে। আর ঈদের নামাজের পর দিলে তা হবে একটা সাধারণ দান-খয়রাত।’ (আবু দাউদ : ১৬১১)।

ইবনে কোতাইবার মতে, সদাকাতুল ফিতর অর্থ হচ্ছে ‘সদাকাতুন নাফস’ অর্থাৎ মানুষের জাকাত। রোজাদার এ জাকাতের মাধ্যমে রোজাকে পবিত্র করে এর সওয়াব বৃদ্ধির কাজ করে থাকে। ‘ময়লা দূর করার জন্য যেমন পানি দিয়ে গোসল দরকার, তেমনি রোজার ত্রুটি ও কালিমা দূর করার জন্য জাকাতুল ফিতর দরকার।’

মানুষের সাধারণ খাবার দ্বারা জাকাতুল ফিতর পরিশোধ করা যায়। আবু সাঈদ আল-খুদরি (রা.) বর্ণিত তিনি বলেন, রাসুল (সা.) এর যুগে আমরা ফিতরা বাবদ (মাথা পিছু) এক সা’ খাবার অথবা এক সা’ খেজুর অথবা এক সা’ যব অথবা এক সা’ পনির অথবা এক সা’ কিশমিশ বা মোনাক্কা প্রদান করতাম। মুয়াবিয়া (রা.) এর যুগে যখন গম আমদানি হলো তখন বললেন, আমার মতে এর (গমের) এক মুদ অন্য জিনিসের দুই মুদের সমান। আবু সাঈদ খুদরি (রা.) বলেন, আমি কিন্তু রাসুল (সা.) এর যুগে যেভাবে (এক সা’ মাথাপিছু) বের করতাম, আজীবন তাই করব। (বোখারি : ১৫০৮)।

ইসলামি প-িতরা মনে করেন প্রত্যেক দেশের সাধারণ খাদ্যদ্রব্য দিয়ে জাকাতুল ফিতর আদায় করা উচিত। আবার যিনি যে মানের খাবার বেশিরভাগ সময় আহার করেন, সে মানের খাবারের ভিত্তিতে জাকাতুল ফিতর আদায় করা উচিত। কোরআন কারিমে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘হে ঈমানদাররা! তোমাদের নিজেদের উপার্জন থেকে এবং আমি তোমাদের জন্য ভূমি থেকে যা উৎপন্ন করেছি তা থেকে উৎকৃষ্ট বস্তু দান কর। তবে এর মধ্য থেকে নিকৃষ্ট বস্তু দান করার সংকল্প করবে না। কেননা তোমরা দেখে শুনে কখনও এ ধরনের খারাপ বস্তু গ্রহণ করবে না। জেনে রেখো; আল্লাহ অভাবমুক্ত, প্রশংসিত।’ (বাকারা : ২৬৭)।

ইমামা মালেক, শাফেয়ি ও আহমদ ইবনে হাম্বাল (রহ.) এর মতে, যেহেতু হাদিসে খাদ্যদ্রব্য দান করতে বলা হয়েছে, সেহেতু টাকা-পয়সা দিয়ে ফিতরা দিলে তা জায়েজ হবে না। কিন্তু কিয়াসের আলোকে ইমাম আবু হানিফা (রহ.) টাকা-পয়সা দিয়ে ফিতরা দেওয়াকে জায়েজ বলেছেন। একাধিকজনের ফিতরা একজনকে এবং একজনের ফিতরা একাধিকজনকে দেওয়া জায়েজ।

জাকাতুল ফিতর প্রদানের অন্যতম লক্ষ্য সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি, ভালোবাসা, সাম্য এবং সমতা। আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে এর প্রভাব অতুলনীয়। আমাদের যাদের সামর্থ্য আছে আমরা শুধু ইসলামিক ফাউন্ডেশনের দেওয়া সর্বনিম্ন ৭০ টাকা না দিয়ে সর্বোচ্চ ২২০০ টাকা করে মাথাপিছু পরিশোধ করতে পারি। হাদিসে বর্ণিত স্তরগুলোর হিসাব করে মাথাপিছু ৭০ টাকা, ১৫০০ টাকা, ১৬৫০ টাকা এবং ২২০০ টাকা নির্ধারণ করেছে ইসলামিক ফাউন্ডেশন। যত বেশি পরিমাণে ফিতরাসহ অতিরিক্ত দান-সদাকা, আদায় করব; তত বেশি পরিমাণে আমাদের নেকির পাল্লা ভারী হবে।

রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘আজ তাদের ধনী করে দাও।’ ঈদের দিন গরিব-মিসকিন ও অসহায় মানুষকে ধনীদের মতো আনন্দ দান করার উদ্দেশ্য সচ্ছল করে দেওয়া। সামর্থ্য অনুযায়ী সর্বোচ্চ স্তরের ফিতরা দানের মাধ্যমে একদিকে যেমন অভাবী মানুষের দুঃখ-দুর্দশা লাঘব করা হয়, অন্যদিকে পবিত্র এ মহাউৎসবের দিনে বিশ্ববাসীর জন্য একটি বিরাট মানবিক ও অবিস্মরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়। কিছু লোক ঈদের আনন্দ উৎসব করবে আর কিছু লোক তা থেকে বঞ্চিত হবে তা কি করে হয়? ধনীর সম্পদের একটা সামান্য অংশ গরিবদের মধ্যে বিতরণ করলে যদি তাদের দরিদ্রতা দূর হয়, তাহলে মানবতার সর্বশ্রেষ্ঠ জীবন ব্যবস্থা ইসলাম কী করে এ ব্যাপারে উদাসীন থাকতে পারে এবং তাদের ঈদের দিন মহান উৎসব থেকে নিরাশ করতে পারে? জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায় :

‘ঈদুল ফিতর আনিয়াছে তাই নববিধান,

ওগো সঞ্চয়ী উদ্ধৃত যা করবে দান,

ক্ষুধার অন্ন থেকে তোমার।

ভোগের পেয়ালা উপচায়ে পড়ে তব হাতে,

তৃষ্ণাতুরের হিস্সা আছে ও পেয়ালাতে দিয়া ভোগ কর, কর বীর দেদার।’

গরিব ও অসচ্ছল পরিবারকে ঈদের দিনের আনন্দে শরিক করার জন্য ফিতরা বাবদ খাদ্যদ্রব্য না দিয়ে নির্ধারিত ফিতরার (খাদ্যসামগ্রীর) মূল্য মসজিদ, মাদ্রাসা, কারও চিকিৎসা ব্যয়, বিয়েশাদি, কারও ঋণ পরিশোধের জন্য প্রদান করা ঠিক নয়। শরিয়তের বিধি-বিধানগুলো আমরা অনেকেই নিজেদের খেয়াল, খুশি মতো পালন করি, যা কোরআন ও সুন্নাহর বিপরীত।

বান্দার প্রতি আল্লাহ তায়ালার নেয়ামতগুলোর মধ্যে অন্যতম নেয়ামত হলোÑ তিনি তার ইবাদত-বন্দেগিতে কোনো ত্রুটি-বিচ্যুতি হলে তা সংশোধন করার ও ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা রেখেছেন। রোজা পালনে যেসব ত্রুটি-বিচ্যুতি হয়ে থাকে, তার ক্ষতি পুষিয়ে দেওয়ার জন্য জাকাতুল ফিতর প্রদানের ব্যবস্থা করেছেন। পাশাপাশি দরিদ্র ও অনাহারক্লিষ্ট মানুষরা যাতে বিশ্বব্যাপী ঈদের আনন্দ উপভোগ করতে পারে, সে ব্যবস্থাও রেখেছেন।

আসুন আমরা সবাই মিলে করোনার মতো বৈশ্বিক মহামারি এই বিপর্যয়ের সময়ে জাকাতুল ফিতরসহ দান-সদকা আদায় করে মহান আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি অর্জনে প্রাণপণ চেষ্টা অব্যাহত রাখি। মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদের তৌফিক দান করুন। আমিন। (সূত্র: আলোকিত বাংলাদেশ)।
লেখক : উপ-রেজিস্ট্রার, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়

- Advertisement -
- Advertisement -
- Advertisement -

আরও সংবাদ

- Advertisement -