- Advertisement -
হোম ধর্ম আর্থসামাজিক উন্নয়নে জাকাতের ভূমিকা

আর্থসামাজিক উন্নয়নে জাকাতের ভূমিকা

- Advertisement -

মাওলানা মুহাম্মদ মুনিরুল হাছান: ইসলামের সুরম্য প্রাসাদ যে পাঁচটি স্তম্ভের ওপর নির্মিত তার মধ্যে অন্যতম হলো জাকাত। এটি ইসলামি সমাজ ও অর্থ ব্যবস্থার মূল চালিকাশক্তি। ইসলামি অর্থনীতিতে যেভাবে অভাবি, বিত্তহীন, নিঃস্ব ও অক্ষম জনগোষ্ঠীর প্রয়োজন পূরণ ও কল্যাণ সাধনের নিদের্শনা প্রদান করা হয়েছে, অন্য কোনো ধর্মে সেভাবে নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা ৩২ বার জাকাতের কথা উল্লেখ করেছেন। তন্মধ্যে ২৮ জায়গায় কোরআন মাজিদে আল্লাহ তায়ালা সালাতের পর জাকাতের কথা উল্লেখ করেছেন। জাকাত ইসলামের তৃতীয় স্তম্ভ। জাকাতের বিধান কোনো দেশ বা কালের গ-িতে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি সামাজিক বৈষম্য হ্রাস করে সমাজে শান্তি স্থাপনে অন্যতম নেয়ামক। ইসলামে সালাতের বিধান দেওয়া হয়েছে আত্মাকে পরিশুদ্ধ করতে এবং সঙ্গে সঙ্গে জাকাতের বিধান দেওয়া হয়েছে সম্পদকে পবিত্র ও পরিশুদ্ধ করতে।

প্রাচীনকালে জাকাত : হজরত আদম (আ.) থেকে শুরু করে সব নবী-রাসুলদের মধ্যে জাকাতের বিধান কার্যকর ছিল। তবে সেটির প্রক্রিয়া ছিল ভিন্ন ভিন্ন। কেননা এটি ছাড়া সমাজ জীবনে ভ্রাতৃত্ব ও মমত্ববোধ প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। আল্লাহ তায়ালা হজরত ইবরাহিম, ইসহাক ও ইয়াকুব (আ.) এর ওপর জাকাতের বিধান দিয়ে বলেন, ‘আমি তাদের নেতা বানিয়েছিলাম, তারা আমার নির্দেশ অনুসারে মানুষকে পথপ্রদর্শন করত। আমি তাদের ওহি প্রেরণ করেছিলাম সৎকর্ম করতে, সালাত কায়েম করতে এবং জাকাত প্রদান করতে। আর তারা আমারই ইবাদত করত’। (সুরা আম্বিয়া-৭৩)। অন্য আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আল্লাহ তায়ালা বনি ইসরাঈলের কাছ থেকে অঙ্গীকার গ্রহণ করেছিলেন এবং তাদের মধ্যে থেকে ১২ জন নেতা নিযুক্ত করেছিলেন, আর আল্লাহ বলেন, আমি তোমাদের সঙ্গেই রয়েছি, যদি তোমরা সালাত কায়েম কর, জাকাত দাও। (সুরা মায়িদা-১২)। অনুরূপভাবে হজরত ঈসা (আ.) এর ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তিনি আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন, যতদিন জীবিত থাকি, ততদিন সালাত ও জাকাত আদায় করতে’। (সুরা মারয়াম-৩১)।

জাকাতের পরিচয় : জাকাত আরবি শব্দ। জাকাত শব্দটি একবচন এর বহুবচন হলো ‘যাকওয়াত’। জাকাতের আভিধানিক অর্থ হলো বৃদ্ধি বা প্রাচুর্য। যেমন, কোনো পরিবারে কেউ বিবাহ করলে একজন সদস্য বেড়ে গেলে বলা হয় ‘যাকাদদারবু’ বা একজন সদস্য বেড়ে গেল। (তফসিরে তাবারি, ১ম খ-, পৃ: ২৯৫)। জাকাতের দ্বিতীয় অর্থ হলো পবিত্রতা। যেহেতু জাকাত ধন-সম্পদকে পবিত্র করে কৃর্পণতা ও পাপ-পঙ্কিলতা থেকে মুক্ত করে। এ অর্থে আল্লাহ তায়ালা বলেন, অবশ্যই সফলতা লাভ করেছে, যে পবিত্রতা অর্জন করেছেন। (সুরা আ-লা: ১৪)। অতএব, জাকাত অর্থ হলো, পবিত্রা, বৃদ্ধি, বরকত ও প্রশংসা। পরিভাষায় জাকাত হলো একমাত্র আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে হাশেমী নয় এবং তাদের আজাতকৃত গোলামও নয়, এমন কোনো গরিব মুসলিম ব্যক্তিকে অর্থ সম্পদের মালিক বানিয়ে দেওয়া। এ শর্তে যে, এতে দাতা দুনিয়াবী কোনো লাভ বা উপকার লাভ করতে পারবে না। ইসলামি পরিভাষায় জীবন যাত্রার অপরিহার্য প্রয়োজন পূরণের পর নিসাব পরিমাণ সম্পদ পূর্ণ এক বছর অতিক্রম করলে ওই সম্পদ থেকে নির্দিষ্ট অংশ (২.৫০ টাকা) আল্লাহর নির্ধারিত খাতে ব্যয় করাকে জাকাত বলে।

জাকাত ফরজ হওয়ার কারণ : মানুষের যাবতীয় সম্পদ-সম্পত্তির মালিক একমাত্র আল্লাহ, এগুলো মানুষের হাতে আমানতস্বরূপ মাত্র। মানুষ নিজ নিজ মেধা ও শ্রম দিয়ে সম্পদ অর্জন করে এবং খরচ করে থাকেন। সম্পদ উপার্জনের যোগ্যতা, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার মধ্যে ব্যাপক তারতম্য রয়েছে। ফলে সমাজের মধ্যে দেখা যায় কিছু কিছু মানুষ সম্পদের পাহাড় গড়ে আরাম আয়েশে জীবন যাপন করছে, বিপরীত দিকে কিছু কিছু মানুষ অভাব অনটনের মধ্যে নিমজ্জিত হয়ে দারিদ্রসীমার নিচে অবস্থান করছে। ধনী দরিদ্রের এই পার্থক্য দূর করার জন্যই আল্লাহ তায়ালা জাকাতের বিধান প্রদান করেছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘যাতে সম্পদ শুধু তোমাদের অর্থশালীদের মধ্যেই অবর্তিত না হয়।’ (সুরা হাশর-০৭)। সুতরাং জাকাত হলো অসহায় ও দরিদ্রের অধিকার। এটি ধনী লোকদের কোনো দয়া ও অনুগ্রহ নয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আর তাদের (ধনীদের) সম্পদে ভিক্ষুক ও বঞ্চিতের অধিকার রয়েছে।’ (সুরা যারিয়াত-১৯)। হজরত আবুযার গিফারী (রা.) প্রিয় নবীজি (সা.) কে জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসুল! আপনি জাকাতের আদেশ করেছেন এর রহস্য কী? জবাবে তিনি বলেন, হে আবুযার, যার আমানতদারিতা নেই, তার ঈমান নেই। যে জাকাত আদায় করে না, তার সালাত কবুল হয় না। আল্লাহ ধনীদের ওপর যে জাকাত ধার্য করেছেন, তা গরিবদের জন্য যথেষ্ট হয়ে যায়। কেয়ামতের দিন আল্লাহ তায়ালা ধনীদের মালের জাকাত দাবি করবেন এবং তাদের শক্ত হাতে শাস্তি দেবেন।

জাকাতের অর্থনৈতিক গুরুত্ব : জাকাত হলো ইসলামি অর্থ ব্যবস্থার অন্যতম উৎস। জাকাতের বিধান বাস্তবায়নের মাধ্যমে সম্পদ শুধু ধনীদের হাতে পুঞ্জীভূত না থেকে বরং দরিদ্র লোকদের হাতেও প্রবাহমান থাকে। এতে বেকারত্ব কমে যায়। মানুষ ক্ষুধার্থ থাকলে বা দারিদ্র্যপূর্ণ জীবনযাপন করলে, অপরাধপ্রবণ হয়ে উঠে। এমনকি তারা ধর্ম-কর্মকেও বিসর্জন দিয়ে দেয়। এজন্য প্রিয় নবীজি (সা.) দারিদ্রতা ও কুফরি থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করেছেন। দারিদ্র্যের কারণে মানুষের চিন্তাশক্তি বিলুপ্ত হয়ে যায়। ইমাম আবু হানিফা (রা.) বলেন, যার বাড়িতে কোনো আটা নেই, তার কাছে কোনো পরামর্শ নিতে যেয়ো না। কারণ তার চিন্তা বিক্ষুব্ধ হতে বাধ্য। সুতরাং জাকাতভিত্তিক অর্থ ব্যবস্থায় কারও পক্ষে সম্পদের পাহাড় গড়া এবং কারও পক্ষে গরিব থাকার সুযোগ নেই। প্রিয় নবীজি (সা.) জাকাতকে ইসলামের সেতুবন্ধ বলে ঘোষণা দিয়েছেন। (বায়হাকী)। জাকাতের সর্বশ্রেষ্ঠ উপহার হলো দারিদ্র্য বিমোচন করা বা দারিদ্র্য মুক্ত সমাজপ্রতিষ্ঠা করা। যার কারণে জাকাত বণ্টনের ৮টি খাতের মধ্যে ৪টি খাতই যেমন ফকির, মিসকিন, দাসমুক্তি, ঋণগ্রস্ত খাতগুলো অসহায় ও অভাবগ্রস্ত মানুষের কল্যাণের জন্য নিবেদিত। প্রিয় নবীজি (সা.) বলেন, যারা দয়াশীল, দয়াময় প্রভু তাদের প্রতি দয়া করেন। যারা জমিনে বিচরণ করে তাদের প্রতি দয়া কর, যিনি আকাশে আছেন তিনি তোমাদের প্রতি দয়া করবেন। (তিরমিজি-১৯৪৭)।

আর্থসামাজিক উন্নয়নে জাকাত : মানুষের আর্থসামাজিক উন্নয়নে ও দারিদ্র্য দূরীকরণে জাকাত একটি গুরুত্বপূর্ণ বণ্টন ব্যবস্থা। সঙ্গে সঙ্গে এটি আর্থসামাজিক উন্নয়নেও মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে। আর্থসামাজিক উন্নয়ন হলো ক্ষুধা-দারিদ্র্য, সন্ত্রাস-চাঁদাবাজিমুক্ত সমাজব্যবস্থা। এ ধরনের সামাজিক অপরাধের মূল কারণ হলো অভাব বা দারিদ্র্যতা। জাকাত হলো এ ধরনের অশুভ কর্মকা-ের মহৌষধ। নবীজি (সা.) এর যুগে ইসলাম নামক স্বর্গীয় জীবন বিধান তৎকালীন আইয়্যামে জাহেলিয়ার সব অন্ধকারের উপর আলোর মশাল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সেই সময়কালে আর্থসামাজিক উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি ছিল জাকাত। নবীজি (সা.) এর যুগে রাষ্ট্রীয়ভাবে জাকাত সংগ্রহ ও বণ্টনের ব্যবস্থা চালু ছিল। তিনি রাষ্ট্রের বিভিন্ন অঞ্চলে জাকাত সংগ্রহ করার জন্য কর্মচারী নিয়োগ দিয়েছিলেন। হজরত আবু বকর (রা.) এর খেলাফত কালে একদল লোক জাকাত প্রদানে অস্বীকার করলে তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন, কেউ জাকাতের ব্যাপারে একটি ‘ইকাল’ দিতেও যদি অস্বীকৃতি জানায়, আমি অবশ্যই তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব। (বোখারি-১৩৯৯)।

পরবর্তীতে খোলাফায়ে রাশেদীনের যুগেও এ পদ্ধতি কার্যকর ছিল। ফলে রাষ্ট্র সব নাগরিকের মৌলিক চাহিদা পূরণে সক্ষম হয়েছিল। জাকাত ব্যবস্থা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন হলে মজুদদারির হাতে সম্পদ পুঞ্জীভূত হয় না। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় প্রিয় নবীজি (সা.) ও পরবর্তী খোলাফায়ে রাশেদীনের কর্মতৎপরতা এবং এরই ধারাবাহিকতায় উমাইয়া খলিফা হজরত ওমর ইবনে আবদুল আজিজ এর খেলাফতে জাকাত গ্রহণকারী লোক খুঁজে পাওয়া দুষ্কর হয়েছিল। অর্থাৎ জাকাত আদায় ও বণ্টনের শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার কারণে মানুষের দারিদ্র্যতা সম্পূর্ণভাবে দূরীভূত হয়েছিল।

বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যা ১০.৫ শতাংশ লোক অতি দারিদ্র্য এবং সার্বিক দারিদ্র্যের হার ২০.৫ শতাংশ। আর মোট জনসংখ্যা প্রায় ২৫ শতাংশ লোক জাকাত প্রদানে সামর্থ্য রাখে। এক হিসেবে দেখা গেছে, বাংলাদেশে ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক হিসেবে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা জাকাত আসে। ব্যক্তিগতভাবে অনেকেই আদায় করে থাকেন, আবার অনেকেই যথাযথভাবে আদায় না করে কিছুসংখ্যক দিয়েই তুষ্ট থাকেন। যার ফলে একদিকে সমাজের বঞ্চিত অংশ তাদের শরিয়া অধিকার পাওয়া থেকে যেমন বঞ্চিত হচ্ছে অন্যদিকে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক উন্নয়নও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অথচ প্রতি বছর জাকাতের ৩০ হাজার কোটি টাকা যদি যথাযথভাবে দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়ন বঞ্চিত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে কাজে লাগানো হতো, তাহলে দেশের অর্থব্যবস্থার ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হতো। তাই রাষ্ট্রীয়ভাবে জাকাত আদায়ে কড়াকড়ি ব্যবস্থা করলে উক্ত টাকা আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে এবং দেশের দারিদ্র্য শূন্যের কোটায় নেমে আসবে।

সহকারী শিক্ষক (ইসলাম শিক্ষা), চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুল। (সূত্র: আলোকিত বাংলাদেশ)।

 

- Advertisement -
- Advertisement -
- Advertisement -

আরও সংবাদ

- Advertisement -