- Advertisement -
হোম ধর্ম রমজানে কোরআন অধ্যয়নের গুরুত্ব

রমজানে কোরআন অধ্যয়নের গুরুত্ব

- Advertisement -

অধ্যাপক মওলানা সাহাব উদ্দিন আহমদ: রমজানের সাথে কোরআনের রয়েছে গভীর সুদৃঢ় সম্পর্ক। কোরআন ও রমজান যেন একাকার হয়ে আছে। মূলত এর প্রয়োজনীয়তা ও আছে। কেন না মাহে রমজান এমন একটি পবিত্র ও নেক মৌসুম, যে মাসে এ মহাগ্রন্থ পড়ার, বুঝার এবং সেই অনুযায়ী জীবন গড়ার জন্য এক আত্মিক পরিবেশ বিরাজমান।

আমরা কোরআন পড়া বলতে বুঝি শুধু তিলাওয়াত করা। অর্থ, ব্যাখ্যা ও মর্ম বুঝার প্রয়োজন অনুভব করি না। অথচ সাধারণ যুক্তিতে দেখা যায় যে,

আমরা যে কোনো ভাষা বা যে কোনো বিষয় পড়ি না কেন, যে সিলেবাস যে কোর্স পড়ি না কেন? তা বুঝেই পড়ি এবং বুঝার জন্যই পড়ি। না বুঝার জন্য কেউ কোনো কিছু পড়ি না। অথচ এক্ষেত্রে আমরা সর্বশ্রেষ্ঠ গ্রন্থ কোরআন পড়ার ক্ষেত্রে অসহায় ও সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ি আমরা আমাদের জীবনে অনেক মাস ও বছরকে না বুঝে পড়েই পার করেছি। এজন্য নিজেদের শক্তি ও সামর্থ্যরে সদ্ব্যবহার করি না। সন্দেহ নেই যে, না বুঝে পড়লেও প্রত্যেক অক্ষরের বিনিময়ে ১০ নেকি পাওয়া যাবে। এতে কোরআনের হক সঠিকভাবে আদায় হয় কি? কোরআন আমদের কী বলে? ‘আমি আপনার কাছে যে কিতাব নাজিল করেছি, তা বরকতপূর্ণ। লোকরা যেন এ আয়াতগুলো নিয়ে চিন্তাভাবনা করে এবং জ্ঞানী লোকরা যেন অবশ্যই তা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে’ (সুরা সোয়াদ : ২৯)। তিনি আরও বলেন, আমি কোরআনকে সহজ করে দিয়েছি বুঝার জন্য। অতএব, কোনো চিন্তাশীল আছে কি? (ক্বামার : ১৭) যারা এ কোরআন নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করে না, আল্লাহ তাদের কঠোর ভাষায় প্রশ্ন করে বলেন, ‘তারা কি কোরআন নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করে নাÑ না কি তাদের অন্তরে তালা লেগে আছে?’ (সুরা- মোহাম্মাদ : ২৪)

কোরআনের অর্থ, ব্যাখ্যা, মর্ম ও তাৎপর্য নিয়ে চিন্তা না করা বদ্ধঅন্তর কিংবা তালাযুক্ত অন্তরের পরিচায়ক। আল্লাহ আমাদের অন্তরকে খুলে দিন এবং তালামুক্ত করুন। রাসুল (সা.) বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে সে ব্যক্তি উত্তম যে কোরআন শিখে ও শিক্ষা দেয়’ (বুখারি : ৪৬৫৭)। এখানে শিখা কিংবা শিক্ষা দেওয়ার অর্থ জবধফরহম তো বটে; আয়াতের অর্থ, ব্যাখ্যাও এর অন্তর্ভুক্ত। তাই শিক্ষা বলতে শুধু কোরআন তিলওয়াতের মধ্যে এবং কোরআন খতমের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা কোরআনের দাবি নয়। শুধু খতম করার জন্যই এ কিতাব নাজিল হয়নি, তাই অর্থ না বুঝে, চিন্তাভাবনা না করে তাকওয়া তথা আল্লাহভীতি ও বিনম্্রভাব তৈরি না করে শুধু তিলাওয়াত ও খতম করা আমাদের মূল লক্ষ্য হওয়া অনুচিত। কোরআনকে জীবন ঘনিষ্ঠ এবং কোরআনময়ী জীবন গঠন করে নিজের জীবনকে কোরআনের প্রতিচ্ছায়া হিসেবে মিনারের মতো মজবুত করে তুলতে হবে। প্রতিক্ষণ কোরআনের আয়নায় দেখতে হবে জীবনকে। তখনই হবে কোরআন নাজিলের সার্থকতা।

আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘যদি আমি এ কোরআনকে পাহাড়ের ওপর অবতীর্ণ করতাম, তাহলে তুমি দেখতে যে পাহাড় আল্লাহর ভয়ে অবনত হতো ও ফেটে চৌচির হয়ে যেত, মানুষের জন্য আমি এ উদাহরণ গুলো পেশ করি; হয়তো তারা চিন্তাভাবনা করবে’ (সুরা হাশর : ২১)। এখন প্রশ্ন হচ্ছেÑ আমরা যারা কোরআন পড়ি তাদের অবস্থা কি পাহাড়ের মতো অবনত হয়? কেন হয় না? নাকি আমাদের অন্তর পাথর কিংবা এর চেয়েও আরও বেশি কঠোর? কোরআন পাঠ করলে যদি আমাদের জীবনে কাক্সিক্ষত পরিবর্তন, ভয়ভীতি ও আশাবাদ না জাগে, তাহলে কোরআন পাঠের পদ্ধতি পুনর্বিন্যাস করে দেখতে হবে। কোরআন এসেছে মানুষকে সহজ-সরল পথ দেখাতে। কোরআন হচ্ছে অন্তরের চিকিৎসা ও আলো এবং জ্ঞান ও দলিল। কোরআন হচ্ছে সৌভাগ্য ও সাওয়াবের বিষয়। কোরআন হচ্ছে আল্লাহর শিক্ষাও চিরন্তন শাশ্বত এক মহান সংবিধান। তাই এ কোরআনকে সে দৃষ্টিকোণ থেকে গ্রহণ ও অনুধাবনের চেষ্টা চালাতে হবে।

ইমাম মালিক (রহ.) রমজান আসলে কোরআন ছাড়া বাকি সব কাজ বন্ধ করে দিতেন। তিনি শিক্ষা দান, ফতোয়া ও লোকজনের সাথে বসা বন্ধ করে দিয়ে বলতেন, এটা কোরআনের মাস। ইমাম জুহরি বলতেন, ‘রমজান হচ্ছে কোরআন তিলাওয়াত ও মানুষকে খানা খাওয়ানোর মাস। আয়েশা (রা.) রমজান মাসে সুবহে সাদেকের পর থেকে সূর্যোদয় পর্যন্ত কোরআন তিলাওয়াত করতেন। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেছেন, কোরআন তিলাওয়াতকারীর উচিত যখন রাতে লোকেরা ঘুমায় ও দিনে খায়, তখন কোরআন তিলাওয়াত করা, লোকেরা যখন হাসে তখন কাঁদা, যখন লোকরা কথায় ব্যস্ত তখন চুপ থাকা, লোকরা যখন চাতুরি করে, তখন বিনীত হওয়া এবং তারা যখন আনন্দ করে তখন তার পেরেশান হওয়া। নবী করীম (সা.) প্রতি রমজানে গেল রমজান থেকে এ পর্যন্ত কোরআনের যেটুকু নাজিল হয়েছে তা জিবরাইলকে পড়ে শোনাতেন। এ হাদিস থেকে রমজানে কোরআন খতমের পক্ষে দলিল পাওয়া যায়। কোরআন নাজিলের বর্ষপূতির এ মাসে প্রতিদিন রোজা রাখতে এবং প্রতি রাতে কয়েক ঘণ্টা দাঁড়িয়ে কোরআন তিলাওয়াত শুনতে কেন জোর দেওয়া হলো? যদি কোরআন মাজিদের অন্তর্নিহিত নিয়ামতের মর্ম বুঝতে পারেন এবং যদি একটু মনোযোগ সহকারে ভেবে দেখেন, কোরআনের ধারক এবং বাহক হলে কী কী দায়িত্ব পালন করতে হবে?

নিয়ামাত যত বেশি মূল্যবান, তার হক আদায় করার দায়িত্বও তত ভারি। আল্লাহর কিতাব ও তাঁর বাণী সবচেয়ে বড় রহমত ও বরকতের জিনিস। যেহেতু এ কিতাব জীবনের আসল উদ্দেশ্য, জীবনের সাফল্য লাভ ও লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য সঠিক পথ প্রদর্শন করে সেহেতু এর বাহকের প্রতি সে দায়িত্বগুলো বর্তায়। এ কিতাব মানুষের সব গোপন, প্রকাশ্য, ব্যক্তিগত ও মানসিক ব্যধির ব্যবস্থাপত্র। এ কিতাব গভীর অন্ধকারে হাবুডুবু খাওয়া লোকদের জন্য আলোর মশাল।

লেখক : উপ-রেজিস্ট্রার, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। (সূত্র: আলোকিত বাংলাদেশ)।

- Advertisement -
- Advertisement -
- Advertisement -

আরও সংবাদ

- Advertisement -