- Advertisement -
হোম স্বাস্থ্য রোজায় গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা : করণীয় বর্জনীয়

রোজায় গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা : করণীয় বর্জনীয়

- Advertisement -

ডা. শাইখ ইসমাইল আজহারী: বছরে এক মাস রোজা রাখার অনেক স্বাস্থ্যগত উপকারিতা এরই মধ্যে বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে। ইসলাম মধ্যপন্থি এক জীবন ব্যবস্থা। জোর করে কারও ওপর কোনো বিধান ইসলাম চাপিয়ে দেয়নি। তাই তো ইসলাম যেভাবে রোজা রাখার আদেশ দিয়েছে সঙ্গে সঙ্গে অসুস্থ ব্যক্তির জন্য কিংবা মুসাফিরের জন্য রোজা ভাঙার অনুমতিও প্রদান করেছে। এখানে আমি গ্যাস্ট্রিকের রোগীদের জন্য রোজায় এসিডিটির সমস্যা নিয়ে কিছুটা আলোচনা করব।

রোজার সময় খুব সাধারণ একটা প্রশ্ন বেশি বেশি শোনা যায় যে, রোজা রাখলে এসিডিটির কোনো সমস্যা হবে কি-না কিংবা গ্যাস্ট্রিকের সমস্যার রোগীর জন্য রোজা রাখলে কোনো অসুবিধা হবে কি-না? এখানে দুটি বিষয় খুব ভালো করে বুঝতে হবে আমাদের। প্রথমে আমরা গ্যাস্ট্রিক রোগ সম্পর্কে কিছুটা বেসিক ধারণা নিই। মানবদেহের পাকস্থলীতে প্রতিদিন প্রায় দেড় থেকে দুই লিটার হাইড্রোক্লোরিক এসিড ক্ষরিত হয়, যার কাজ হচ্ছে পাকস্থলীতে খাবার পরিপাক করতে সহায়তা করা। যদি কোনো কারণে পাকস্থলীতে এই হাইড্রোক্লোরিক এসিড ক্ষরণের মাত্রা বেড়ে যায় তাহলে পাকস্থলীর অভ্যন্তরীণ আবরণ তথা মিউকাস মেমব্রেনে প্রদাহ তৈরি হয়, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় গ্যাসট্রাইটিস বলে। অতিরিক্ত খাবার খেলে কিংবা অনেকক্ষণ না খেয়ে থাকলে কিংবা বেশি বেশি তৈলাক্ত খাবার খেলে পাকস্থলীতে হাইড্রোক্লোরিক এসিডের মাত্রা বেড়ে যায় এবং প্রদাহ হয়, যাকে আমরা গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করে থাকি।

গ্যাস্ট্রাইটিসের উপসর্গ : ১. পেটের উপরি অংশে ব্যথা হবে। ২. বুক জালা পোড়া করবে। ৩. খাবারের আগে পরে পেট ব্যথা হতে পারে। ৪. খাবারের সময় বুকে বাঁধ পড়ার মতো অনুভব হবে। ৫. ঢেঁকুর আসবে। ৬. বমি বমি ভাব থাকবে এবং খাবারের চাহিদা কমে যাবে। ৭. অল্প খাবারেই পেট ভরে গেছে মনে হবে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, একজন সুস্থ মানুষ রোজা রাখলে তার এসিডিটি হওয়ার কোনো সম্ভাবনা আছে কি-না? যদি এক কথায় আমরা উত্তর দিই তাহলে বলতে হয়, একজন সুস্থ মানুষ রোজা রাখলে তার এসিডিটি হওয়ার তেমন কোনো সম্ভাবনা নেই যদি সে ইফতারি ও সাহরিতে নিম্নোক্ত নিয়মগুলো মেনে চলে।

ইফতারের সময় যা করতে হবে

১. ইফতারে অতিরিক্ত তৈলাক্ত খাবার কিংবা তেলে ডুবিয়ে যেসব খাবার তৈরি করা হয় যথা পেঁয়াজু, আলুর চপ, বেগুনি, চিকেন ফ্রাই, জিলাপি ইত্যাদি যতটুকু সম্ভব পরিহার করতে হবে।

২. একসঙ্গে অনেক বেশি খাবার খেয়ে ফেলা যাবে না। অনেকে ইফতারে বসেই খেতে খেতে ইসোফেগাস তথা গলবিল পর্যন্ত খেয়ে ফেলে, তা কখনোই করা যাবে না।

৩. ইফতারে ইসুপগুলের শরবত, ডাবের পানি ইত্যাদি খাওয়া, যাতে পরে শর্করা জাতীয় খাবার যথা খেজুর, পেয়ারা, ছোলা, সেমাই ইত্যাদি খাওয়া যেতে পারে।

৪. ইফতার হতে হবে লাইট মিল কিংবা অল্প পরিমাণ খাবার। তারপর মাগরিবের নামাজ পড়ে রাতের খাবার খেয়ে নেওয়া ভালো। সম্ভব হলে তারাবির নামাজের আগেই খেয়ে নিতে হবে। তাহলে খাবারের পরে কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করে নামাজ পড়তে গেলে নামাজের সময় এক ধরনের ব্যায়াম হয়ে যাবে এবং সেটা খাবার পরিপাকের ক্ষেত্রে সহায়ক, সেইসঙ্গে এসিডিটি হওয়ার ঝুঁকি কমে যাবে।

৫. অবশ্যই রোজার মাসে এসিডিটি থেকে বাঁচার জন্য ডিনার কিংবা সাহরি উভয়ক্ষেত্রে শোয়ার ১ ঘণ্টা আগে খাবার শেষ করতে হবে এবং খেয়ে অবশ্যই কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করে তারপর ঘুমাতে হবে। অন্যথায় এসিডের ব্যাক ফ্লো হয়ে এঊজউ-এর মতো রোগ হতে পারে।

৬. টক জাতীয় ফলে যদিও প্রচুর পরিমাণ ভিটামিন সি থাকে তথাপি টক জাতীয় ফলে সাইট্রিক এসিডও থাকে। তাই রোজার সময় টক ফল সাবধানতার সঙ্গে খেতে হবে। ভালো হয় রাতের খাবার শেষ করে খেলে।

৭. টমেটো ইফতারির সময় অনেকের প্রিয় খাবার, তবে টমেটোতে প্রচুর পরিমাণ সাইট্রিক এসিড ও ম্যালিক এসিড থাকে এবং এটা পাকস্থলীতে ইরিটেশন করে, তাই টমেটো বেশি পরিমাণ না খাওয়াই উত্তম।

৮. ঝাল খাবার পাকস্থলীতে এসিডিটির পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়, তাই কাঁচা মরিচ কিংবা অতিরিক্ত ঝাল খাবার পরিহার করে চলতে হবে।

৯. গরম খাবার যথা চা, কফি ইত্যাদি পাকস্থলীতে হাইড্রোক্লোরিক এসিড ক্ষরণের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়, তাই রোজার সময় চা, কফি ইত্যাদি পরিহার করে চলা উচিত।

সাহরির সময় যা করণীয়

রাসুলে করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দেরিতে সাহরি করার কথা বলেছেন। এটা সুন্নত, এই সুন্নত পালনের স্বাস্থ্যগত উপকারিতা রয়েছে। সাহরি করে ফজর নামাজের প্রস্তুতি নেওয়া এবং ফজর নামাজের প্রস্তুতি নিয়ে নামাজ শেষ করে কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করতে যে ৩০-৪০ মিনিট সময় লাগবে তা খাবার পরিপাকে সহায়তা করে। তাই দেরিতে সাহরি করা সুন্নত আর সাহরি করে নামাজ পড়ে তারপর ঘুমানো স্বাস্থ্যের জন্যও উত্তম। সাহরির খাবারেও এসব জিনিস পরিহার করা উচিত, যা পাকস্থলীতে এসিডিটি তৈরি করে। যেমন চর্বি জাতীয় খাবার, অতিরিক্ত তেলে ভাজা খাবার, চা কফি ইত্যাদি।

এবার আলোচনায় আসি যাদের আগে থেকেই এসিডিটি কিংবা গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা রয়েছে, তাদের করণীয় কী? মূলত যাদের এসিডিটির সমস্যা কিংবা গ্যাস্ট্রিক রোগ রয়েছে তারা গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ খেতে পারেন চিকিৎসকের পরামর্শক্রমে এবং রোজা রাখতে পারবেন আর সঙ্গে সঙ্গে উপরের নিয়মগুলো মেনে চলতে হবে। গ্যাস্ট্রিকের কয়েক ধরনের ওষুধ রয়েছে, তার মধ্যে এন্টাসিড কিংবা ল্যান্সোপ্রাজল ক্যাপসুল খাওয়া যেতে পারে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী। এন্টাসিড প্লাস সিরাপ সন্ধ্যায় খাবারের পরে খাওয়া যায় আর ল্যান্সোপ্রাজল ক্যাপসুল ভোর রাতে খেলে উপকার পাওয়া যায়। ল্যান্সোপ্রাজলের কার্যকারিতা দীর্ঘসময় থাকে। তথাপি মেডিসিন নেওয়ার পরেও যদি কারও রোজা রাখতে বেশি কষ্ট হয় অথবা যদি প্রচ- বুকে ব্যথা ওঠে তাহলে তার জন্য বিশেষজ্ঞ দ্বীনি ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ করে রোজা ভঙ্গ করার অবকাশ রয়েছে।

মহান আল্লাহ আমাদের পবিত্র রমজান মাসের গুরুত্ব বুঝে সিয়াম সাধনা করার তৌফিক দান করুন।

লেখক : চিকিৎসক, ঢাকা কমিউনিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, মগবাজার, ঢাকা

ismailayhari49@gmail.com                       (সূত্র: আলোকিত বাংলাদেশ)।

- Advertisement -
- Advertisement -
- Advertisement -

আরও সংবাদ

- Advertisement -