বিশ্বের বৃহত্তম গালিচার মসজিদ

এম আব্দুল্লাহ

১৯ জানুয়ারী, ২০২৪ ০৮:৫২ পূর্বাহ্ন

বিশ্বের বৃহত্তম গালিচার মসজিদ

শেখ জায়েদ মসজিদ। সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজধানী আবুধাবিকে আলোকিত করেছে এটি। প্রতিবছর লাখ লাখ মানুষ আবুধাবিতে যান এই মসজিদটি দেখতে। এ মসজিদে মুসলমান ছাড়াও অন্য ধর্মের পর্যটকদের প্রবেশাধিকার রয়েছে। এতো মানুষ মসজিদটি দেখতে ভিড় জমালেও, শেখ জায়েদ মসজিদে রয়েছে এক ধরনের প্রশান্তি আর অদ্ভুত সুনসান পরিবেশ।

সংযুক্ত আরব আমিরাতে অসংখ্য মসজিদ রয়েছে। শেখ জায়েদ মসজিদটি বৃহত্তম এবং সবচেয়ে নান্দনিক স্থাপত্যকলায় মাথা উঁচু করে আছে। সারাবিশ্বের পর্যটকদের কাছে এটি কতোটা জনপ্রিয়, তার প্রমাণ ছোট একটি পরিসংখ্যান। বছরে প্রায় কোটি পর্যটক এ মসজিদ পরিবদর্শন করেন। ২০১৮ সালে ভ্রমণ বিষয়ক ওয়েবসাইট ট্রিপ এডভাইজারের করা র‌্যাংকিংয়ে বিশ্বের তৃতীয় জনপ্রিয় স্থাপনা হিসাবে উঠে আসে মসজিদটির নাম।

আবুধাবির জাঁকজমকপূর্ণ কারুকাজময় এই মসজিদটি তৈরির কাজ শুরু হয় ১৯৯৬ সালে। ৩৮ টি প্রখ্যাত ঠিকাদারি কোম্পানির ৩ হাজার দক্ষ কর্মী বাহিনী এ মসজিদ নির্মাণ করেন। সে সময়ে ইতালি, জার্মানি, মরক্কো, পাকিস্তান, ভারত, তুরস্ক, মালয়েশিয়া, ইরান, চীন, যুক্তরাজ্য, নিউজিল্যান্ড, গ্রিস ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ অনেক দেশের কাঁচামালে নির্মাণ করা হয় এ মসজিদ। শেখ জায়েদ মসজিদের নকশায় পাকিস্তান, ভারত ও মরক্কেোর প্রভাব স্পষ্ট রয়েছে। সরকারী কোষাগার থেকে নির্মিত এ মসজিদ নির্মাণে খরচ হয়েছে $৫৪৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।

অনেকে বলেন, স্থাপত্যশিল্পের জন্যে এ  মসজিদটি একটি পাঠশালা। নানাদেশের স্থাপত্যবিদ্যার শিক্ষার্থীরা এ মসজিদের স্থাপত্যকলা সরেজমিনে দেখতে ও শিখতে আসেন। চার কোণে চারটি মিনারে পুষ্পশোভিত নকশা রয়েছে। যার উচ্চতা ৩৫১ ফুট (প্রায় ১০৭ মিটার)। নকশা নির্মাণের জন্য ব্যবহার করা হয়েছে দীর্ঘস্থায়ী মার্বেল পাথর, মূল্যবান স্ফটিক পাথর ও মৃৎশিল্প। শেখ জায়েদ মসজিদের নকশায় মুঘল এবং মুরিস মসজিদ, গম্বুজ বিন্যাস ও ফ্লোর বিন্যাসে বাদশাহি লাহোরে মসজিদ, মিনারে দ্বিতীয় হাসান মসজিদ (মরক্কো) এর প্রভাব স্পষ্ট বলে মনে করেন স্থাপত্যবিদরা।

আরবের ২০০ বছরের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও শিল্পচর্চার নমুনা ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করা হয়েছে মার্বেল পাথর, সোনা, মূল্যবান পাথর, স্ফটিক ও মৃৎশিল্পের বিভিন্ন উপকরন ব্যবহার করে। সংযুক্ত আর আমিরাতের মোহাম্মদ মান্দি আল তামামি , সিরিয়ার ফারুক হাদ্দাদ এবং জর্দানের মোহাম্মদ আলামের ক্যালিওগ্রাফি ও নকশা চোখে পড়বে মসজিদজুড়ে।

ডিজাইন ও নির্মাণে ইতালি, জার্মানি, মরক্কো, পাকিস্তান, ভারত, তুরস্ক, মালয়েশিয়া, ইরান, চীন, যুক্তরাজ্য, নিউজিল্যান্ড, গ্রিস ও সংযুক্ত আরবসহ অনেক দেশ থেকে কারিগর ও উপকারণ ব্যবহার করা হয়েছে। মসজিদটিতে আছে ছোট-বড় সাত আকারের ৮২টি গম্বুজ। যা নির্মাণ করা হয়েছে স্বেত মার্বেল দিয়ে। মসজিদের বৃহত্তম গম্বুজের উচ্চতা ২৭৯ ফুট।

শেখ জায়েদ গ্র্যান্ড মসজিদ অনেক বিশেষ এবং অনন্য উপাদান আছে। প্রধান নামাজকক্ষে ইরানের কার্পেট কোম্পানি তৈরি যা ইরানী শিল্পী আলী খালিদির ডিজাইনে বিশ্বের বৃহত্তম গালিচা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই গালিচার সাইজ ৬০ হাজার ৫৭০ বর্গ ফুট এবং ওজন ৩৫ টন। নিউজিল্যান্ড এবং ইরানের উল থেকে তৈরি করতে প্রায় দুই বছর সময় লেগেছিল। দিনের বেলায় মসজিদটি চোখে ভাসে সাদা আলোয়। রাতের মায়াবি রূপ পর্যটকদের বিমোহিত করে। বর্ণিল আলোয় ঝিলমিল করে মসজিদের চারপাশ।

স্ফটিক সচ্ছ লক্ষ লক্ষ পাথরের তৈরি পৃথিবীর বৃহত্তম ঝাড়বাতিটি এই মসজিদে। জার্মানির তৈরি ঝাড়বাতিটির ব্যাস ১০ মিটার (৩৩ ফুট) এবং উচ্চতা ১৫ মিটার (৪৯ ফুট)। বিশ্বের দ্বিতীয় ও তৃতীয় বৃহত্তম ঝাড়বাতিও এই মসজদকেই অনন্যতা দিয়েছে। মসজিদটির আঙিনা ১৭ হাজার বর্গমিটার মার্বেল মোজাইকের। পরিসংখ্যান বলছে- এটি পৃথিবীর সর্ববৃহৎ আয়তনের মার্বেল মোজাইক।

মূল মসজিদের ধারণ ক্ষমতা ৭ হাজার মুসল্লির। সঙ্গেই রয়েছে আরও দুটি অংশ। একেকটি দেড় হাজার মুসল্লির ধারণ ক্ষমতা সম্পন্ন। তন্মধ্যে ১ টি মহিলাদের জন্য। মূল মসজিদ ও আঙ্গিনা মিলিয়ে ৪০ হাজার মুসল্লি একসঙ্গে নামাজ পড়তে পারে। জুম্মা ও ঈদে সর্বমোট দেড় থেকে দুই লাখ মুসল্লি নামাজ আদায় করেন।
শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমও এই মসজিদের মাধ্যমে পরিচালনা করা হয়। আধুনিক ও ইসলামী বইয়ের এক অনন্য সংগ্রহশালা রয়েছে মসজিদ লাইব্রেরীতে। ইসলামী বিশ্বের বৈচিত্র্য এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের ঐতিহ্য ফুটিয়ে তুলতে সংগ্রহ করা হয়েছে আরবি, ইংরেজি, ফরাসি, ইতালীয়, স্পেনীয়, জার্মান ও কোরীয়সহ বিভিন্ন ভাষার বই।
মসজিদটি দেখতে নানা ধর্মের নারী পুরুষের সমাগম প্রতিদিন চোখে পড়ে। অমুসলিম মহিলাদের বোরকা পরিয়ে মসজিদে ঢুকানো হয়। রয়েছে কড়া নিরাপত্তা আর পর্যটকদের জন্য মসজিদের প্রবেশ পথে ফ্রি গাড়ি সার্ভিস।

মসজিদটি দেখার জন্য কোনো টিকিট কাটতে হয় না। দর্শনার্থী নিয়ন্ত্রণের কোন ব্যবস্থাও চোখে পড়েনি। প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য এটি খোলা থাকে। রাত ৯টার পরে আর কোনো দর্শনার্থী প্রবেশ করতে পারেন না। এই সময়সূচীর ব্যতিক্রম হয় শুধু শুক্রবারে। শুক্রবারে জুমার নামাজের দিকে খেয়াল রেখে এদিন দর্শনার্থীদের প্রবেশ করতে দেওয়া হয় বিকাল সাড়ে চারটা থেকে।

কোনো প্রকার ফি ছাড়াই একজন গাইড আপনাকে ঘুড়িয়ে দেখাবেন এই মসজিদটি। বিকেল পাঁচটা থেকে শুরু হয় আলোকসজ্জা। সূর্যাস্তের পর এই মসজিদটির আলোকসজ্জা আপনার চোখ জুড়িয়ে দেবে। দিনের বেলার চেয়ে সন্ধ্যার পর মসজিদটি সম্পূর্ণ ভিন্ন মনে হবে।
একটি মুসলিম স্থাপত্য হিসাবে এখানে প্রবেশের জন্য আপনাকে অবশ্যই পরিশীলিত পোশাক পরিধান করতে হবে। নারীদের পা, হাত এবং মাথা ঢেকে রেখে এবং পুরুষদের শালীন পোশাক পরতে হয়, যা তাদের শরীরকে ঢেকে রাখে।

২০১৩ সালের জানুয়ারিতে মসজিদটি পরিদর্শনের সৌভাগ্য হয় আমার। বন্ধু ওসমান গণির আমন্ত্রণে দুবাই সফরের সময় আবুধাবি’র বিশ্বখ্যাত স্থাপনাটি পরিদর্শনের সুযোগ হাতছাড়া করিনি। আমরা আসরের পরে মসজিদটি পরিদর্শনে যাই। আসরের নামাজ আদায় করি। যতক্ষণ ছিলাম, যে দিকে তাকিয়েছি প্রাণটা জুড়িয়ে গেছে। (লেখাটি ফেসবুক থেকে নেয়া)।

 

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক




ফিচার - এর আরো খবর

 ঝিনাইদহের ঐতিহ্যবাহী ঢোল সমুদ্র দীঘি

ঝিনাইদহের ঐতিহ্যবাহী ঢোল সমুদ্র দীঘি

১৯ জানুয়ারী, ২০২৪ ০৮:৫২ পূর্বাহ্ন

মৌমাছির সঙ্গে সখ্যতা হৃদয়ের

মৌমাছির সঙ্গে সখ্যতা হৃদয়ের

১৯ জানুয়ারী, ২০২৪ ০৮:৫২ পূর্বাহ্ন

বিশ্বের বৃহত্তম গালিচার মসজিদ

বিশ্বের বৃহত্তম গালিচার মসজিদ

১৯ জানুয়ারী, ২০২৪ ০৮:৫২ পূর্বাহ্ন

ফেনী হবে বাংলাদেশের অন্যতম পর্যটন জেলা

ফেনী হবে বাংলাদেশের অন্যতম পর্যটন জেলা

১৯ জানুয়ারী, ২০২৪ ০৮:৫২ পূর্বাহ্ন

সাহসী নারীর গল্প

সাহসী নারীর গল্প

১৯ জানুয়ারী, ২০২৪ ০৮:৫২ পূর্বাহ্ন

পিরোজপুরকে মনে রেখেছেন আবু আলী মো: সাজ্জাদ হোসেন

পিরোজপুরকে মনে রেখেছেন আবু আলী মো: সাজ্জাদ হোসেন

১৯ জানুয়ারী, ২০২৪ ০৮:৫২ পূর্বাহ্ন